যার পরিনাম ভয়াবহ মৃত্যু

ড. শেখ মহঃ রেজাউল ইসলাম

শুক্রবার, মে ২২, ২০২০ ২:৩১ অপরাহ্ণ

সারা বিশ্বের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা অনেকটা শংকিত।বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তো বটেই। সরকারের পরামর্শ,নিদে’শনা, স্বাস্থ্যবিধি ইত্যাদি না মানার ফলে অনেকটা খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের।

ইতোমধ্যেই প্রশাসন,পুলিশ,কৃষি,স্বাস্থ্য,ব্যাংক, সংবাদমাধ্যম ইত্যাদি সেক্টর থেকে এবং,দেশের বুদ্ধিজীবি সহ অনেক মুল্যবান জীবন আমরা হারিয়েছি। সামান্য একটা ভাইরাসের কাছে বলতে গেলে আমরা পরাজিত। পারমানবিক বোমা, জীবানু অস্ত্র, এগুলো মানুষ ব্যবহার করতে পারে এধরণের কথা প্রায়ই শুনতাম।এগুলোর বিশ্লেষণে আমি যাব না।প্রতিদিনই এগুলো শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি।

আজ আমি অন্য একটা ভয়াবহ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো । হাঁ বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে।আমাদের সবার জীবন বিপয’স্ত হতে পারে! এজন্যই লেখা শুরুর আগেই বলে ফেললাম ভয়াবহ মৃত্যুর কথা।না বলেওতো উপায় নাই। যা নিজের চোখ আর উপলব্ধিতে বুঝতে পারছি তাই লিখছি।
ইচ্ছে করেই শুরুটা করলাম একটা ভয়াবহ পরিনামের কথা দিয়ে।দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এবং কিছুটা গবেষণার (Research) অভিজ্ঞতা আছে বিধায় একান্তই নিজের উপলব্ধি ও দায়িত্ববোধ থেকে আমার এই লেখাটি।

আমরা কি খাচ্ছি? এবং এর ভয়াবহ পরিণাম কি হতে পারে? এর উপর আজ লেখার চেষ্টা করব। ভেজাল খাদ্য নিয়ে আমার এই লেখাটি কারো সামান্য উপকারে আসলে আমি কিছুটা হলেও নিজেকে ধন্য মনে করব।

প্রথমত আমরা যে সকল ফসল,শাকসবজি,ফলমূল খাচ্ছি তার উৎপাদন কলাকৌশল নিয়ে কথা বলবো।
প্রতিটা ফসল উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক জীবন চক্র সম্পন্ন করতে ১৬টা বা ১৮ টা বা মতান্তরে ২১ টা খনিজ দ্রব্য গ্রহন করে থাকে বা খেয়ে থাকে।এগুলোকে বলা হয় অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান(Essential elements)। যেমন হাইড্রজেন,কাব’ন,অক্সিজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, নাইট্রোজেন,ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার,জিংক, আয়রন, কপার ইত্যাদি। সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে মোটামুটি ২০০ টা বা তার অধিক ফসলের চাষ করা হয়।বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুলোর কৃষিবিদরা প্রায় প্রতিটা ফসলের অনেকগুলো করে জাত উদ্ভাবন করেছেন।প্রতিটা ফসলের রাসায়নিক সারের মাত্রা ভিন্ন,এবং প্রতিটা ফসলের বিভিন্ন জাতের জন্যও সারের মাত্রা ভিন্ন।আবার বাংলাদেশকে ৩০ টা Agro Ecological Zone (AEZ) এ ভাগ করা হয়েছে।৩০ টা জোনের মাটিতে জৈবপদার্থ, খনিজ পদার্থ, মাটির অম্লত্ত্ব,কালার ইত্যাদির ভিন্নতা রয়েছে।অর্থাৎ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ফসলের জন্য সারের মাত্রার ভিন্নতা রয়েছে। এখানে সারের মাত্রা বলতে সুষম সারের মাত্রা বুঝানো হয়েছে।অর্থাৎ যতটুকু সার ফসলের জন্য দরকার ঠিক ততটুকুই প্রয়োগ করতে হবে।এর চেয়ে কমও না আবার বেশীও না।আবার আয়তনের ভিত্তিতে মাটির মধ্যে ৫% জৈব পদার্থ, ৪৫% খনিজ পদার্থ, ২৫% বায়ু এবং ২৫% পানি রয়েছে।এই আয়তনের খাদ্য উপাদান সার্থকভাবে ফসল উৎপাদনের জন্য দরকার।অবশ্য এগুলোর মধ্যে বায়ু এবং পানির পরিমানের পরিবর্তন হতে পারে।

যেখানে সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করার নির্দেশনা রয়েছে সেখানে আমাদের কৃষকরা যার যা খুশী সেই মাত্রার সার জমিতে ব্যবহার করছে।এতে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমন জমির মাটিতে অতিরিক্ত মাত্রায় এসিড বা ক্ষারের আবির্ভাব হচ্ছে।ফলশ্রুতিতে প্রায় ক্ষেত্রেই মাটি বিষাক্ত (Toxic) হয়ে যাচ্ছে।এই বিষাক্ততা ফসলের ভিতর চলে যাচ্ছে। অসম পরিমাণ সার ব্যবহার করার ফলে এবং মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ না করার ফলে বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমান ০.২৫-১.৮৩% এ দাঁড়িয়েছে,বা বলতে পারি মোটামুটিভাবে ১% এ দাঁড়িয়েছে যা খুব ভয়াবহ। অথচ এই জৈব পদার্থ ফসলের খাদ্য উপাদানের স্টোর হাউজের মত কাজ করে,মাটির পানি ধারন ক্ষমতা বাড়ায়,তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে,মাটির মধ্যে অনুজৈবিক কাজ বাড়ায় (Microbial activities)।মাটির উপর অত্যাচার করার ফলেই জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে গেছে।বাংলাদেশ সয়েল রিসোস’ ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট SRDI বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলার জন্য উপজেলা সয়েল ম্যাপ তৈরী করেছে যার মধ্যে উপজেলার কোন জমিতে, কোন ফসলের জন্য, কোন সার,কতটুকু দিতে হবে সুন্দর করে লেখা আছে।কিন্তু কোনরকম পরামর্শ ছাড়াই কৃষকেরা অসম মাত্রায় যত্রতত্র রাসায়নিক সার ব্যবহার করে এবং জৈব সার( গোবর, পচা পাতা, খুড়কুটা ইত্যাদি) ব্যবহার করে না। অতি মাত্রায় কান্ডজ্ঞানহীনভাবে কীটনাশকের ব্যবহারতো আছেই। এসব কারনেই ডাটা,ফুলকপি এবং অন্যান্য সবজি রান্নার সময় সিদ্ধ হয় না এবং অনেক সময় তিতা লাগে।এটাই বিষাক্ততা।অথচ ২০/২৫ বছর আগেও আলু,কপি,ডাটা,সিম,বেগুন, কুমড়া,পালং শাক,লাল শাক এসবের একটা আলাদা স্বাদ এবং ফ্লেভার ছিল।কারন তখন মাটিতে প্রচুর পরিমান গোবর সার প্রয়োগ করা হত।অর্থাৎ অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে আমরা বিষাক্ত ফসল পাচ্ছি এবং তা দেদারছে খাচ্ছি।যত্রতত্র ভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ফসলে,ফল,শাকসবজিতে ব্যবহার করছে আমাদের কৃষকরা।সকালে কীটনাশক ফল,শাকসবজিতে স্প্রে করে বিকেলেই বাজারে নিয়ে আসছে বিক্রি করতে। আবার কোন পোকার জন্য,কোন কীটনাশক, কতটুকু ব্যবহার করতে হবে তা কৃষকরা জানে না বা মানেও না।
ক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী (Mode of action)) কন্ট্রাক্ট,সিস্টেমিক,রিপেলেন্টস্,ফিউমিগ্যান্টস্ ইত্যাদি ভাগে কীটনাশককে ভাগ করা হয়।এর মধ্যে কিছু কিছু কীটনাশক এর কায’কারীতা ২৪ ঘন্টা থাকে।যেমন-নগস।এগুলো শাকসবজিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।আবার কিছু কিছু কীটনাশকের কায’কারীতা ৭ দিন,১০দিন,৩০দিন,৩ মাস,১ বছর বা বহু বছর থাকতে পারে। আবার রাসায়নিক গঠন অনুযায়ী অর্গানো ক্লোরিন,অর্গানো ফসফরাস ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয়।( কীটনাশকের শ্রেণীবিভাগ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলাম না,শুধুমাত্র ধারনা দেবার চেস্টা করেছি )।কৃষকেরা যার যা খুশী কীটনাশক ব্যবহার করছে যা আমাদেরকে খুব ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে।বিশেষ করে অর্গানো ক্লোরিন গ্রুপের কীটনাশক ফল, শাক সব্জিতে ব্যবহার করছে এবং ব্যবহারের পর পরই তা বাজারে বিক্রি করছে।এই ক্লোরিন গ্রুপের কীটনাশক বাজেয়াপ্ত ডিটিটি( ডাই ক্লোর ডাই ফিনাইল ট্রাই ক্লোর ইথেন) গ্রুপের। ইন্ডিয়াতে ব্যবহার নিষিদ্ধ হিল্ড্রান এই গ্রুপের কীটনাশক যা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ফল,শাকসবজিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেমন যশোর, কুষ্টিয়া,ঝিনাইদহ, টাংগাইল,নর্থ বেংগলের বিভিন্ন জেলায় কলা,আম,শাকসবজি তে ব্যবহার করা হচ্ছে।এইসব ফল,শাক সবজি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে।সুতরাং আমরা পরম তৃপ্তিতে বিষ খাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

সাদা চাউলে লাল রঙ মিশিয়ে ঢেঁকি ছাটা চাল বলে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। নিম্ন মানের চাল পালিশ করে তা মিনিকিটস্ চাল হিসাবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে যার খাদ্যমান(Food value) নেই বললেই চলে। এসব খাবার খেয়ে ড্যামেজ হচ্ছে আমাদের কিডনি, লিভার,লাং।জীবনীশক্তি হারাচ্ছি দিনদিন। বিভিন্ন হাসপাতালে গেলে এসব রোগের ভয়াবহতা কিছুটা আঁচ করা যায়।

তবে আশার কথা এই যে,কীটনাশক প্রয়োগ না করে এবং সুষম সার ব্যবহার করে কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রথমত IPM(Integrated Pest Management), অতঃপর ( ICM (Integrated Crop Management) পদ্ধতি এবং সবশেষে GAP ( Good Agricultural Practices)এ ফসল ফলাতে কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করছে এবং অনেকটা সাফল্য লাভ করেছে যা প্রশংসার দাবী রাখে।

আবার ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিষাক্ত নোংরা পানি দিয়ে সেচ দেয়া হচ্ছে।এসব পানিতে ভারী পদার্থ যেমন সীসা,ক্রোমিয়াম, স্ক্যান্ডিনিয়াম সহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ থাকছে যা পানির মাধ্যমে ফসলে যাচ্ছে।এখান থেকে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। ধ্বংশ করছে আমাদের কিডনি, লিভার,লাং সহ অন্যান্য অংগ প্রত্যঙ্গ। আমরা আক্রান্ত হচ্ছি ক্যান্সার এর মত মরন ব্যধিতে। স্নায়ুতন্ত্র, রক্ত পরিবহন তন্ত্র,পরিপাক তন্ত্র বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।আমি নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ে কিছুদিন চাকুরী করেছি। মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে ঢাকার বুড়িগঙ্গা,বালি ও তুরাগ নদীর উপর একটা প্রতিবেদন তৈরী করেছিলাম এবং কিছু সুপারিশ করেছিলাম। এই সব নদীর পানির বিষাক্ততা এবং এই পানি দিয়ে সেচের মাধ্যমে ফসল ফলানোয় ফসলের বিষাক্ততার প্রমান পেয়েছিলাম।সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় কৃষকদেরকে পচা,নোংরা,দুগ’ন্ধযুক্ত পানি দিয়ে সেচ দিতে দেখেছি। আমাদের জন্য এসব খুব ভয়ংকর মেসেজ।

দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের সবজি কিনে তা বস্তায় পুরে ময়লা পানিতে ভিজিয়ে রেখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে যা আমরা প্রতিনিয়ত খাচ্ছি। যারা ঢাকা শহরে বাস করেন তারা বাজার করতে গিয়ে দেখবেন প্রায় ক্ষেত্রেই ভিজা পোটল বস্তার মধ্যে থাকে। এটাই প্রায়ক্ষেত্রে পচা পানিমিশ্রিত পোটল।

কাঁঠাল,তরমুজ, আনারস পাকানোর জন্য ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে বিষাক্ত ওষুধ পুশ করা হচ্ছে।কলা,আম ইত্যাদি বিষাক্ত কীটনাশক ও কারবাইড জাতীয় পদার্থ দিয়ে পাকানো হচ্ছে অপরিকল্পিত ভাবে।

এবার পোল্ট্রি ও ডেইরী নিয়ে কিছু কথা বলবো।
আমাদের পোল্ট্রি ও ডেইরী ফামে’ যে ফিড ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে প্রায় ক্ষেত্রেই অতি উচ্চমাত্রায় ভারী পদার্থ (Heavy metals)রয়েছে।ট্যানারির দুষিত বজ্য’ থেকে প্রায়ই এসব পোল্ট্রি ফিড বানানো হচ্ছে। সুতরাং এগুলো মুরগীর মাংশের ভিতর চলে আসছে,যেমন ক্রোমিয়াম,সীসা,স্ক্যান্ডেনিয়াম ইত্যাদি। মুরগীর মাংশে ক্রোমিয়াম এর সহনশীল মাত্রা যেখানে ২৩-৩৮ মিলি মাইক্রো ইউনিট সেখানে আমাদের দেশের খামারের মুরগীর ভিতর ২২০০-৩৮০০ মিলি মাইক্রো ইউনিট পাওয়া গেছে যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপুন’।আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা এবং সব বয়েসের মানুষই রেস্টুরেন্টে বসে দিন রাত এই মাংশ পোড়া খাচ্ছে।ঢাকা শহরতো বটেই,মফস্বল শহরগুলো, এমনকি গ্রামেও এই কাঁচা মাংশ খেতে দেখা যায়।এই মাংশ বড়জোর ১০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পুড়ানো হয় অথচ ক্রোমিয়াম ধ্বংস করতে লাগে ২৯০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার মত। খাওয়ার সময় মুরগীর মাংশে তাজা রক্তও পাওয়া যায়।দিব্যি, খুব মজা করে আমরা সবাই খাচ্ছি।

যে ঘাস গরুতে খায় তার ভিতরও কীটনাশকের রেসিডুয়াল ইফেক্ট থাকতে দেখা গেছে।তাছাড়া গরুর দুধের মধ্যে এবং মাংশে কীটনাশক ও ক্রোমিয়াম এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।তাহলে কি খেয়ে বাঁচবো আমরা? কি খাচ্ছি আমরা?
কিছু কিছু সবজি ও ফলে এবং মিষ্টি তে টেক্সট কালার ব্যবহার করা হচ্ছে।যে টেক্সট কালার কাপড় রঙ করার কাজে ব্যবহার করা হয়।

কৃত্রিম ভাবে ঘি,দধি বানানো হচ্ছে।এসব তৈরী করতে নাকি টিস্যু পেপার ব্যবহার করা হচ্ছে।
নোংরা পানি বোতলে ভরে বিক্রি করা হচ্ছে।বেকারি ফ্যাক্টরিতে নোংরা পরিবেশে পাউরুটি, বিস্কুট ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরী করা হচ্ছে।
অনেক হোটেল রেস্টুরেন্টে পচা বাসি মাংস ও অন্যান্য খাবার খাওয়ানো হচ্ছে।জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে কাজ করার সময় এগুলো কাছ থেকে দেখেছি এবং লক্ষ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছি। এখন এই অধিদপ্তরটি আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং কাজ করে যাচ্ছে।এখানকার কম’কতা’রা বেশ কয়েকজন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত! তারা সহ সবার সুস্থতা কামনা করছি।

পুকুর ও নদীর তরতাজা মাছে ফরমালিন জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে তা অনেক সময় তাজা রাখার চেস্টা করা হচ্ছে।পুকুরের পানিতে বিষাক্ত ভারতীয় নিষিদ্ধ হিল্ড্রান জাতীয় কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। এতে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved oxygen) পরিমাণ কমে যায় এবং মাছ পানিতে ভেসে ওঠে। এতে সহজে মাছ ধরা যায়।অনেক সময় খেয়াল করলে দেখা যায় যে রান্না করা তরকারীতে কেরোসিন এর গন্ধ পাওয়া যায়।এই মাছই হিল্ড্রান দিয়ে ধরা।

চারদিকের এইসব ভেজাল খেয়ে আমরা দিন দিন মনের অজান্তেই অসুস্থ হয়ে পরছি।কিডনি, লিভার ড্যামেজ হচ্ছে।ক্যান্সার হচ্ছে। শরীরের বিভিন্ন সিস্টেম দিন দিন নিস্তেজ হয়ে পরছে।মাথা ধরা,বমিভাব,চোখে ঝাঁপসা দেখা, চলতে ফিরতে কষ্ট ,এলাজি’, মনে অশান্তি,রাতে ঘুম না হওয়া,বদ হজম,পেটের পীড়া,খিটমিটে মেজাজ,স্ট্রোক ,গায়ে ক্ষত,পুরুষত্ব হ্রাস,মেয়েদের শক্তি হ্রাস ইত্যাদি ভেজাল খাবার খাওয়ার কারনে হচ্ছে।সবকিছু কেমন যেন ছ্যাড়া ব্যাড়া অবস্থা।হাসপাতাল গুলোতে গেলে বুঝা যায় হাজার হাজার রোগী এসব রোগ নিয়ে ভতি’ হয়েছে।বহু কিডনির রোগী,লিভারের রোগী হাসপাতালের বারান্দায় আহাজারি করছে।আল্লাহ সবাইকে মাফ করুন ও হেফাজতে রাখুন।৭১ সালের যুদ্ধে বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছিলেন।পশ্চিমাদের সাথে যুদ্ধ করে আমরা জয়ী হয়েছিলাম।ওদেরকে চোখে দেখা যেত তাই নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছি। কিন্তু নিজের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এসব ভেজাল খাবার আমাদের সবার পেটে যাচ্ছে প্রতিদিন ।এসব নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা ভাবনা করা দরকার যা সরকার করে যাচ্ছে।সবাইকে সচেতন হতে হবে।সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না।

আমাদের উপর তলার মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেনীর মানুষকে ধীরে ধীরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।আমরা অবশ্যই চিন্তিত! দিন দিন আমরা শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরছি,অসুস্থ জাতীতে পরিণত হচ্ছি,মেধা শুন্য হয়ে পরছি।আসুন সবাই মিলে এসব ভেজালের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াই। প্রয়োজনে আরো কঠিন আইন করা দরকার।আমরা এভাবে তো মরতে পারি না। তদানিন্তন র‍্যাবের মহাপরিচালক,বত’মান আইজিপি মহোদয় জনাব বেনজীর আহমেদ এঁর একটি মন্তব্য দেখেছিলাম।তিনি খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেয়া মানুষ গুলোর মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখতে বলেছেন। আসলে এরুপ কঠিন আইনের দরকার।নইলে এরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে।

যাইহোক, এসব থেকে উত্তোরনের জন্য আমার একান্ত নিজস্ব কিছু সুপারিশ :

১।ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আইসিএম,জিএপি পদ্ধতি ব্যবহার করা দরকার।
২। জমিতে সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৩। জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
৪।জেলা উপজেলা পযা’য়ে কৃষি অফিসারের প্রেস্ক্রিপশন ছাড়া কোন সার,কীটনাশক ক্রয় ও ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করা দরকার।
৫। ফল পাকানোর জন্য কোন ধরনের কীটনাশক বা অন্য কোন মেডিসিন ব্যবহার করা যাবে না।ব্যবহার করলেও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিতে হবে।সরকার খুব ভাল পদক্ষেপ নিয়েছে।আম বাগানের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব প্রশংসার দাবী রাখে।
৬। ফ্রেস কীটনাশক মুক্ত শাক সবজি খাওয়ার জন্য ছাদ কৃষি ও বসত বাড়ীর আংগিনায় সবজি ও ফলের চাষ করা যায়।
৭।জমিতে সেচ দেয়ার সময় পরিষ্কার পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৮।এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার করতে হবে এবং সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৯।জাতীয় ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ সহ অন্যান্য আইনের প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
১০।জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা,উপজেলা ও ইউনিয়ন পযা’য়ে সকল স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে সমন্বিত কায’ক্রম গ্রহন করতে হবে। প্রশাসনের নজরদারি জোড়দার করতে হবে।
১১।নিরাপদ খাদ্য কতৃ’পক্ষকে বাস্তব ভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
১২।প্রতিটি হাট বাজারে একটা ক্যাম্প থাকবে(বাজারের প্রবেশ পথে), সেখানে সরকারী,বেসরকারি সংস্থা ও জনগনের সমন্বয়ে সবাই উপস্থিত থাকবেন।টেস্টিং কিডস্ থাকবে এখানে।সব ধরনের মাছ,মাংশ,সব্জি,ফল টেস্ট করে বিক্রির অনুমতি দিতে হবে।আমি থাইল্যান্ড এ এরুপ ব্যবস্থা দেখেছি।
১৩।জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।

সবো’পরি সবাইকে সচেতন হতে হবে। সরকার অত্যন্ত আন্তরিক ভাবে ভেজাল বিরোধী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সন্মিলিতভাবে সবাইকে ভেজালের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে,নইলে ধুকে ধুকে মরতে হবে যে মরন ঢাকঢোল পিটিয়ে আসবে না।সাবধান হতে আজই,এখনই।

লেখকঃ অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রনালয়

image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৪
  • ১২:০৭
  • ৪:৪৩
  • ৬:৫৩
  • ৮:১৮
  • ৫:১৮

ক্যালেন্ডার

July 2020
M T W T F S S
« Jun    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031