মুজিববর্ষেই পুর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন হোক! 

বুধবার, মার্চ ৪, ২০২০ ৮:১১ অপরাহ্ণ
অসাম্প্রদায়িক চেতনার সৃজনশীল মানুষ গড়তে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিমনস্ক অসাম্প্রদায়িক চেতনার সৃজনশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে সরকার প্রতি জেলাতে দশ’টি করে বিদ্যালয়ে সংগীত ও তবলা বাদক শিক্ষক নিয়োগ সহ  বাজনার যন্ত্রাংশ দিবে সেই সাথে উপজেলা পর্যায়ে লাইব্রেরি মিলনায়তন মাল্টিপারপাস হল উন্মুক্ত মঞ্চ সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করেছে এমন কথাই গণমাধ্যকে  বলেছেন আমাদের সংস্কৃতি বিষয়ক  প্রতিমন্ত্রী কে,এম খালিদ। খবরটা আমাদের জন্য অনন্দের এবং গর্বের তো বটেই, এর জন্য মাননীয়  প্রধানমন্ত্রী আজীবন জাতীর কাছে সমাদ্রিত হবেন। কারন বেশ কিছুদিন আমরা পত্র-পত্রিকায় এমন চাওয়ার কথাই বলেছি, আমাদের চাওয়া ছিল দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের শিক্ষা ব্যাবস্থার সঙ্গে সাংস্কৃতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য।
শিশুরা ছয় বছর বয়স থেকে সংগীত ও সংস্কৃতি শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হয়ে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজকে খুব সহজেই সংগীত শিক্ষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। কেননা  প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে কলেজ  জীবন পর্যন্ত যদি সংগীত শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ না থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নতুন একটা অনুষদে ভর্তি হয়ে বিষয়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওটা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে  আমাদের দেশে ছেলে মেয়েরা সংগীত নিয়ে পড়ালেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং তাতে আগামী দিনের জন্য সংগীতের  গুরু বা সাধক  তৈরীর কাজটা কঠিক হয়ে পড়েছে ইতোমধ্যেই। আমাদের চাওয়া বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী থেকেই  সরকার প্রাথমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায়  সংস্কৃতি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে শিশুদের সঠিকভাবে সংগীত, চারুকারু নাটক, আবৃত্তি প্রত্নতত্ব ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ক সিলেবাস প্রনয়ন করে পৃথকভাবে  শিক্ষাদানের সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে । তাতে শিশু আর কিছু না পাক অন্তত সংগীতের মৌলিক  বিষয়গুলো সুর, তাল, লয়, ছন্দ, গীত, বাদ্য, নৃত্য, স্বর, সপ্তক ইত্যদির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বিত শিক্ষা  ব্যবস্হার মধ্য দিয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাবে।
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক  ড. দেবাশিষ মণ্ডল তাঁর ‘স্কুল জীবনে সংগীতের প্রয়োজনীয়তা’ প্রবন্ধে লিখেছেন ” শিশু যখন  পায়ে পায়ে চলতে শেখে তখনই তার ছন্দবোধের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ চোখে পড়ে। ছন্দের যে সুখ বড়রাও তা অনুভব করে ছোট্ট শিশুর কাছ থেকে। তার চলা, বলা অনুকরণ করে। লক্ষনীয় ছন্দে, সুরে, ঘুর্ণনে, নাটকীয়তায় শিশুরও দুর্বার আকর্ষণ। “। আর যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক ডক্টর নিনা ক্রাউস তাঁর এক গবেষণায় বলেছেন  যে,”সংগীত শিক্ষায় শিশুদের স্মৃতিশক্তি বাড়ে এবং এটা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হতেও সহায়তা করে। শিশুরা প্রকৃতিগতভাবেই সংগীতপ্রিয়”।  অতীত গ্রিসেও  সংগীতকে  শিক্ষা দানের  গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিবেচনা করে  ছেলেদের ছ-বছর বয়স থেকেই সংগীতের শিক্ষা দেয়া হতো।  এডমন্ড স্মিথ বলেছেন “যে মানুষের আত্মার সঙ্গে সংগীতের বাস সেই মানুষই ভালবাসতে জানে”।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন “আত্মপ্রকাশের জন্যে বাঙালি স্বভাবতই গানকে অত্যন্ত করে চেয়েছে। সেই কারণে সর্বসাধারণে হিন্দুস্থানী সংগীতরীতির একান্ত অনুগত হতে পারে নি। সেইজন্যেই কানাড়া তাড়ানা মালকোষ দরবারী তোড়ির বহুমূল্য গীতোপকরণ থাকা সত্ত্বেও বাঙালিকে কীর্তন সৃষ্টি করতে হয়েছে। গানকে ভালোবেসেছে ব’লেই সে গানকে আদর করে আপন হাতে আপন মনের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করতে চেয়েছে। তাই, আজ হোক কাল হোক, বাংলায় গান যে উৎকর্ষ লাভ করবে সে তার আপন রাস্তাতেই করবে”( শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সংগীতের স্থান, ফাল্গুন  ১৩৪২ )।
তা তো ঠিক কিন্তু আজও আমাদের দেশে  সরকারী ভাবে সংগীতের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যাল গড়ে উঠেনি , কেবল কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ক অনুষদ আছে মাত্র যা,  সংগীত শিক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। সরকার যদি এ ক্ষেত্রে আলাদা পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  করে তাহলে দেখা যাবে এক সময়  বে-সরকারী ভাবে সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে উদ্যক্তরাও এগিয়ে আসবে।
আমাদের  সময় এসেছে  সংস্কৃতিমূখী শিক্ষাকে লেজুড়বৃত্তি  থেকে বের করে  পৃথক ভাবে  সংগীত,  শিক্ষা কে পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করে   আগামীর উন্নত বাংলাদেশের জন্য  সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও আধুনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার । আধুনিকমনা উন্নত অনেক দেশই তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নবদিগন্ত তৈরী করেছে। সিনেমা জগতের মাধ্যমে সারা বিশ্বকে তাদের মুখী করেছে ভারত। শান্তি নিকেতন কিংবা বিশ্ব  ভারতীর মত প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশকে যেভাবে বিশ্বদরবারে সম্মানিত করছে তেমনি বাংলার সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিটি কর্মকান্ড যেন বিশ্ববাসীকে ২০৪০’র বাংলাদেশকে আরো অধিক শক্তি সামর্থ্য শৌর্যবীর্যে অভিজাত্যে মানবিক বিশ্বনাগরিক ভাবনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে- সে লক্ষ্যে সংস্কৃতি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক দিককে প্রাধিকারভুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে ২০৪০ শে পৌঁছুতে হবে আমাদের।
স্বাধীনতার এতটা পরে এসেও যে মৌলিক জাতীয়তাবোধ, চেতনা কিংবা সত্বার উপর ভর করে এদেশের স্বধীনতা অর্জিত হয়েছে সেটি থেকে আমরা দিন দিন দুরেই সরে যাচ্ছি। ফলে দৃশ্যমান  অনেক উন্নতি আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু প্রশান্তি আসছেনা কোনভাবেই বরং এক অজানা অচেনা অস্থিরতা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত সময় পার হচ্ছে। শান্তিকামী দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ আশ্রিত গুনাবলির সমন্বয় ঘটিয়ে যে শিক্ষা আমাদেরকে শিক্ষিত করে কাঙ্খিত সুনাগরিক তৈরী করতে পারতো, সেই সংস্কৃতি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রুপ আমরা  আমাদের দেশকে আজো উপহার দিতে পারিনি উল্টো স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ যারা পরিচালনা করেছেন কেউ কেউ অত্যন্ত সচেতনভাবে সতর্কতার সাথে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন ওটার সাথে সখ্যতার মানেই হলো একটি অপরাধ কিংবা পাপ কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা।   ফলে আজকের বাস্তবতায় ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড মানে অনেক জনমনেই পাপবোধের ক্রিয়া প্রতিফলিত হচ্ছে।
বিধায়  পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দবোধ, ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাষ্ট্র বিনির্মানের  জন্য মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চা তথা সংগীত   শিক্ষা, চারুকারু, নাট্যতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব শিক্ষা  বিকশিত করা জরুরী এর জন্য দরকার আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।  সংগীত, নৃত্য ও নাটক, প্রত্ন ও চারুকলার,  মধ্যে অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে হৃদয়াবেগ ও সমাজচেতনার সূক্ষ্মতম দিকগুলিকে খুঁজে পাওয়া যাবে অনায়াসে। তাই মানবিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষার জন্য বর্তমান সমাজে সংস্কৃতি শিক্ষার  বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার  প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মুজিববর্ষ থেকেই এর শুভ  যাত্রা শুরু  করার প্রস্তাবনা করছি।
এস,এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার
পুলিশ সুপার ও সংস্কৃতিকর্মী
image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৪৬
  • ১২:০৮
  • ৪:২৮
  • ৬:১৫
  • ৭:২৮
  • ৫:৫৭

ক্যালেন্ডার

March 2020
M T W T F S S
« Feb    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031