বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: বাঙালির অফুরন্ত প্রেরণার উৎস

শনিবার, মার্চ ৭, ২০২০ ৮:১৪ অপরাহ্ণ
জাহাঙ্গীর আলম

পৃথিবীর ইতিহাসে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী দ্বিতীয় দেশ বাংলাদেশ। প্রথম দেশ হিসেবে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ টি স্টেট একত্রিত হয়ে থমাস জেফারসনের নেতৃত্বে ‘কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস’ ঔপনিবেশিক শক্তি বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ বাংলাদেশ। আর বাঙালি জাতির এই পরাধীনতা মুক্ত হবার আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেও ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণই ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ হিসেবে বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরনা যুগিয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রায় ১৮ মিনিটের এই ভাষণে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এর পাশাপাশি সমসাময়িক পাকিস্তানের উভয় অংশের দৃশ্যমান বৈষম্যের চিত্র যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভবিষ্যতের করণীয় ও নির্দেশনা তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। সর্বোপরি সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধে উজ্জীবিত করেছেন তাঁর এই ভাষণে।

যুদ্ধকালে দেয়া অনুপ্রেরণামূলক এই ভাষণটি বিশ্লেষণ করেই মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজ উইক শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিক কবি উপাধি দিয়েছিলো। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু লাখো জনতার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৩ বছরের শাসন-শোষণ, নির্যাতন-নিপীড়ন,বৈষম্য ও বঞ্চনার ইতিহাস যেমন বলেছেন তেমনি বাঙালির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার দিকনির্দেশনামূলক কথাও শুনিয়েছেন এদিনের এই ভাষণটিতে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. হারুন-অর-রশিদ ‘রাজনীতি, সরকার ও শাসনতান্ত্রিক উন্নয়ন’ শীর্ষক গ্রন্থে বলেন,”বঙ্গবন্ধু তার সংক্ষিপ্ত অথচ তেজস্বী ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতি ও বাঙালিদের ইতিহাস ব্যাখ্যা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালিদের দ্বন্দ্বের স্বরূপ উপস্থাপন, অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা, সারা বাংলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ, প্রতিরোধ সংগ্রাম শেষাবধি মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত, শত্রুর মোকাবেলায় গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন ও যে কোন উস্কানির মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পরামর্শ দান করেছেন”। বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনের ইতিহাস বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে মুক্তির সনদও বলা যায়। হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি মুক্তির আকাঙ্ক্ষা লালন করেছে যুগের পর যুগ। কিন্তু মুক্তি মেলেনি।

সেই মুক্তিকামী জনতার স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সেদিন ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে আগত প্রায় ১০ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে দুপুর ১২ টার মধ্যেই সমাবেশস্থল পূর্ণ হয়ে যায়। শুধু একটি ঘোষণা- মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় সমগ্র জাতি। বিকাল ২.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু আসার কথা থাকলেও একটু দেরী করে ২:৪৫ মিনিটে ভাষণ শুরু করেন বাঙালির মহানায়ক। শেষ হয় ৩.০৩ মিনিটে। ঐদিন লাখো জনতার হর্ষ ধ্বনিতে মুখরিত হয় রেসকোর্স ময়দান যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। “তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ- বাংলাদেশ, “তোমার আমার ঠিকানা – পদ্মা মেঘনা যমুনা” “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর -বাংলাদেশ স্বাধীন কর” “তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ মুজিব শেখ মুজিব” “ভুট্টোর মুখে লাথি মারো-বাংলাদেশ স্বাধীন কর” ” জয় বাংলা- জয় বাংলা” স্লোগানে স্লোগানে সেদিন প্রকম্পিত হয়েছিলো বাংলার আকাশ।

অবশেষে তিনি শোনালেন তাঁর অমর বাণী “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। একটি ভাষণ কিভাবে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে ৭ মার্চের ভাষণ তার জ্বলন্ত প্রমান । পৃথিবীর ২,৫০০ বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষণের জায়গায় আব্রাহাম লিংকনের ‘ গেটিস বার্গ ভাষণ’, মার্টিন লুথার কিং এর ‘ আই হ্যাভ এ ড্রিম’ সহ বঙ্গবন্ধুর ভাষনটিকেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১২ টি ভাষায় বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ অনুদিত হয়েছে। তাই এ কথা বলা অত্যুক্তি হবেনা যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু বাঙালি জাতির নয়, সমগ্র বিশ্বের শোষিত-নির্যাতিত স্বাধীনতাকামী মানুষের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে জাগ্রত থাকবে।

জাহাঙ্গীর আলম

শিক্ষক, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

প্রধান সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ টিচার্স নেটওয়ার্ক (বিটিএন) ও সম্পাদক, বিটিএন নিউজ ২৪ ডট কম

image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৭
  • ১২:০৬
  • ৪:২৯
  • ৬:১৮
  • ৭:৩৩
  • ৫:৫০

ক্যালেন্ডার

April 2020
M T W T F S S
« Mar    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930