নাটিকা ‘লকডাউন’- সৈয়দ মুহাম্মদ জুবায়ের

  সৈয়দ মুহাম্মদ জুবায়ের

সোমবার, এপ্রিল ১৩, ২০২০ ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

দৃশ্য ১ঃ বাবা, দুই ছেলে ও মা
স্থানঃ টিভি রুম
সময়ঃ দিন ১২.০০

ফারদিন তার দুই ছেলেকে নিয়ে টিভিতে সংবাদ দেখছে।

সংবাদঃ সারা দেশে লক ডাউনের কারনে গরিব মানুষরা খেতে পারছে না। তারা কাজে যেতে পারছে না বলে তারা কোন বাজার করতে পারছে না। দিন আনি দিন খাই গরীবদের বাসায় তাদের ছেলে মেয়ে পরিবার না খেয়ে আছে।
এরুপ সংবাদ চলতে থাকে।
ফারদিনের হাতে মোবাইল ফোন। ফেসবুকে স্ক্রল করতেই দেখে সরকারের দেয়া চাল ডাল চুরি করছে। কেউ কিছু বলছে না।
চাল ডাল দেয়ার নামে চলছে ফটোসেশন। খারাপ ব্যাবহার করছে এই সন গরীবদের সাথে।

আয়াস ও আয়ানের মাথায় কিছু প্রশ্ন চলে এলে বাবাকে প্রশ্ন করে।

আয়াসঃ বাবা ওরা কেন খেতে পারবে না?
বাবাঃ সারাদেশেতো লক ডাউন দিয়ে দিয়েছে বাবা। তাই জন্য গরীবরা কাজ করতে পারছে না।
আয়ানঃ লক ডাউন কি বাবা?
বাবাঃ লক ডাউন হলো কেউ তাদের বাসা থেকে বের হতে পারবে না।
আয়াসঃ কেন বের হতে পারবে না?
বাবাঃ তোমরা তো জানোই করোনা ভাইরাসের কারনে এই লক ডাউন। যাতে এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়ায় না পরে৷
আয়ানঃ কেন বাবা সবাই হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুলে আর মাস্ক পরলে তো করোনা ভাইরাস ছড়াবে না।
আয়ানঃ হ্যাঁ বাবা। হাত চোখে মুখে না দিলে হাঁচি ঢেকে দিলেতো করোনা ভাইরাস ছড়ায় না।
আয়াসঃ এই গরীব লোকরা তাহলে কেমনে খাবে বাবা?
বাবাঃ করোনায় আক্রান্ত মানুষ যদি বের হয় তাহলে তো বাবা এই ভাইরাস ছড়াবে। খবরে দেখেছো না দিন দিন এই ভাইরাসের আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছেই। কেন বাড়ছে? কারন এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ বের হলে তারা যেখানে ঘুড়বে সেখানের মানুষরা আক্রান্ত হয়ে যাবে।
আয়াসঃ তাহলে গরীবরা কি করবে বাবা? তাদের পরিবারে রান্না না হলে কি খাবে তারা?
বাবাঃ সরকার তাদের জন্য চাল ডাল তেল সাবান দিয়ে সাহায্য করছে। তাছাড়াও কিছু মানুষ নিজ থেকেও সাহায্য করছে।

রান্না ঘর থেকে মা এসে রাগান্বিত স্বরে বলল, এদের সারাদিন প্রশ্ন করতে হবে। এটা কি? ওটা কি? এ কেনো? ও কেনো? এত প্রশ্ন না করে পড়াশুন করো যাও। গোসল করে পড়তে বসো।

একটা বাজারের লিস্ট হাতে দিয়ে বাবাকে বলল, শোন এই নাও এসব বাজার লাগবে। বাসায় কিছু নাই। সবজি বলতে কিছুই নাই। আর তুমি মাস খানেকের বাজার করে রাখো না কেনো আমি বুঝি না? এই সময় কিছু বাজার স্টকে রাখাটা ভালো। তা তুমি কি বুঝো না?
বাবাঃ শুনো এই সময় খাবার মজুদ করা উচিৎ না দেশের এই অবস্থায় খাদ্য মজুদ করলে জিনিস পাতির দাম বেড়ে যাবে।
মাঃ তোমার একার দেশ নিয়া চিন্তা। বাকি সব মানুষ এই সময় খাদ্য দ্রব্য মজুদ করছে। তুমি মজুদ করলেই দেশের টান পরে যাবে।
বাবাঃ দেশের মানুষ যে গরীবের চাল চুরি করছে বলে আমিও চুরি করবো? তুমি কি বলো এসব? এখন আমাদের দেশকে সাপোর্ট দেয়া উচিৎ। সরকার যে ভাবে বলছে সে ভাবে চলা উচিৎ।
মাঃ যা খুশি করো গে। যাও এখন এসব বাজার লাগবে।
আয়ান আয়াস গোসলে যাও। গোসল করে নাও। না হয় খুব রাগ করবো কিন্তু।

বাবা বাজারের ব্যাগ নিয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বেরিয়ে পরলো।
আয়ান আয়াস গোসলে গেলো।

দৃশ্যে ২ঃ
আয়ান ও আয়াস।
স্থানঃ গোসল খানা ( বাথরুম)

গোসল করতে করতে দুই ভাই কথা বলে
আয়ানঃ ভাই শুনছিস, সরকার যে গরীবদের খাদ্য দিচ্ছে তা আবার চুরি করছে। তাহলে গরিবরা কেমনে খাবে?
আয়াসঃ ভাইয়া গরীবদের চাল কেনো চুরি করে? যারা চুরি করে তাদেরও মনে হয় খাওয়া নাই বাসায়। তাই না ভাইয়া।
আয়ানঃ হুম। তা না হলে কেন চুরি করবে। ওরাও চুরি করে বাসায় তাদের ছেলে মেয়েদের খেতে দেয়।
আয়াসঃ ভাইয়া আমাদের পাশে যে গরীবদের বাসা তারাও তাহলে খাইতে পারে না তাই না?
আয়ানঃ হুম আমরা দেখবো আজকে বারান্দায় গিয়ে। দেখি ওরা কি করে।
গোসল শেষ করে।

দৃশ্য ৩ঃ
স্থানঃ বারান্দা

বাসার পাশে একটা বস্তি এলাকা।
আয়ান ও আয়াস দুই ভাই বারান্দায় গিয়ে দাড়িয়ে দেখে বস্তিবাসীরা কি করে।
পারলে কিছু বস্তির দৃশ্য দেখানো যেতে পারে।

দৃশ্য ৪ঃ
স্থানঃ বাসা

কলিং বেল বাজে।
দুই ভাই দরজা খুলতে গেলে মা তাদের আটকায়। মা গিয়ে দরজা খুলে। ঘর থেকে হেক্সাজল এনে ফারদিনের হাতে ঢালে। যতটা পারা যায় সব পরিস্কার করে সোজা বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয় ফারদিন। বাচ্চাদের জন্য ভয় করে খুব এই কোভিড-১৯ ভাইরাস যদি কোন ভাবে বাসায় চলে আসে আর রক্ষা নাই। ফারদিনের স্ত্রী বাজার গুলো নিয়ে যতটা পারা যায় পরিস্কার করে নেয়। যেমন যে সব পলিথিনের বা প্লাস্টিকের মোরক আছে সে সব ডিটারজেন্ট পানি দিয়ে পরিস্কার করে তুলে রাখে। আর কাচা বাজার পানিতে চুবিয়ে রাখে।

দৃশ্য ৫ঃ
স্থানঃ আয়াস আয়ানের রুম

আয়াস ও আয়ান তাদের রুমে হারমনিয়াম বাজিয়ে গান করছে। আয়ান অতন্ত্য মেধাবী এই কম বয়সেই সে হারমনিয়াম বাজিয়ে গান করতে পারে। তাছাড়া আয়ান কোন গান শুনলে সে হারমনিয়ামে তুলতেও পারে।

“ভায়ের মায়ের এতো স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহো।
ও মা তোমার চরন দুটি বক্ষে আমার ধরি।
আমার এই দেশেতে জন্ম যেন
এই দেশেতে মরি।।”

বাবা গোসল করে বের হয়ে বাচ্চাদের রুমে আসে।।
বাবাঃ এখন একটা সিনেমা দেখবো আমরা।
আয়াসঃ কি সিনেমা দেখবো বাবা।
বাবাঃ দেখি কোনটা দেখা যায়।
দৃশ্য ৬ঃ
স্থানঃ বাবার কম্পিউটার রুমে

বাবা কম্পিউটারের সামনে বসে কোন সিনেমা চালাবে সেটা ভাবছে আর খুজছে। একবার একটা ছাড়ে আবার অন্যটা৷ কোনটাই তার পছন্দ হয় না। ঠিক এসময় আয়াস বলে উঠে।
আয়াসঃ বাবা। এই যে চাল চুরি করে যারা তাদেরও বাসায় খাবার নাই, তাই চুরি করে, না বাবা। ওদের কেনো খাবার দেয় না। তাহলেতো ওরা আর চুরি করবে না।
বাবাঃ কিছুক্ষণ চুপ থাকে  ভাবে যে বাচ্চারা কত ভালো চিন্তা করে এদের মাথায় আসেনা যে চুরি যারা করে তারা শিক্ষিত, বড়লোক। গরীবরা আর কি চুরি করবে। দেশের সম্পত্তি তো সব চুরি করে আমলা, মন্ত্রী, চেয়ারমেন, কমিশনার।
আয়ানঃ বাবা ওরা চুরি করে কেন, লজ্জায় বলতে পারে না, তাই না বাবা।
বাবা বলতে পারলো না যে ওরা সরকারের লোক।
বাবাঃ এখন সবাই মিলে হিরক রাজার দেশে সিনেমা দেখব তাহলে সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবা।
বাবা হিরক রাজার দেশে সিনেমা চালিয়ে দিলো। আর বলল, এটা সত্যজিত রায়ের সিনেমা। কেমন। এখন চুপ করে সিনেমা দেখবো তারপর সব প্রশ্ন করবে। ঠিক আছে।

দৃশ্য ৭ঃ
স্থানঃ খাবার টেবিল

মার আজকে রান্না করতে দেরি হয়। বলে খেতে ডাকতেও দেরী হয়। কারন বাজার করতে দেরী হয়েছে।
ওদিকে বাবা বাচ্চারা সিনেমা শেষ করে উঠে। মা খাবার টেবিলে খাবার সাজিয়ে তাদের খেতে ডাকে।
সবাই একসাথে খেতে বসে।
বাবা মা সবাই খাওয়া শুরু করলেও আয়াস ও আয়ান খায় না।  চুপ করে বসে থাকে।

মাঃ তোমরা খাও না কেনো?
বাবাঃ খাওয়া শুরু করো।
আয়াস ও আয়ানঃ না খাবো না।
মাঃ খাবা না কেনো?
আয়াসঃ বাবা-মা, গরীবরা সব কিছু করে আমাদের জন্য আর তারা খেতে পায়না। তাই আমরাও খাবো না।
বাবা ও মার চোখে পানি এসে যায়। এইটুকু দুইটা বাচ্চা এই গরীবদের দুঃখটা বুঝে আমরা বড়রা বুঝি না।
বাবাঃ ওরাও খাবেতো।
আয়ানঃ বাবা আমাদের পাশে যে গরীবরা আছে তারা খেলে আমরা খাবো।
আয়াসঃ হ্যা বাবা তারাওতো না খেয়ে আছে।
বাবাঃ আচ্ছা তোমরা খাও। আমরা ওদের খাওয়া কিনে দিবো কেমন।
আয়ানঃ সত্যিতো।
মাঃ হ্যা খেয়ে নাও তাদের কিনে দেয়া হবে। সত্যি।

দৃশ্য ৮ঃ
স্থানঃ আয়াস আয়ানের রুম, বারান্দা, বস্তি এলাকা।

আয়ান তার রুমে হারমনিয়াম বাজিয়ে গান করছে।
‘হিরক রাজার দেশে’ সিনেমার গান সে বাজিয়ে তুলার চেষ্টা করছে।

“দেখো ভালো জনে রইলো ভাংগা ঘরে।
মন্দ জনে সিংহাসনে চড়ে
সোনার ফসল ফলায় যে তার দুই বেলা জোটে না আহার
হিরের খনির মজুর হয়ে কানা করি নাই
ও ভাই ভাইরে ভাইরে।।”
আয়াস বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে বাস্তি এলাকার দিকে।

বাবা পাশের গরীব বস্তিতে খাবার দিচ্ছে।

 নাট্যকার: প্রভাষক, থিয়েটার এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,তেজগাঁও কলেজ,ঢাকা।

image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৪
  • ১২:০৭
  • ৪:৪৩
  • ৬:৫৩
  • ৮:১৮
  • ৫:১৮

ক্যালেন্ডার

July 2020
M T W T F S S
« Jun    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031