নভেরা আহমেদ, সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পী

ফারজানা আকসা জহুরা

মঙ্গলবার, মার্চ ১০, ২০২০ ৫:২৯ অপরাহ্ণ

নভেরা আহমেদ, সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পী

নভেরা আহমেদ, আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত, এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে রক্ষণশীল সমাজে বেড়েওঠা তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে বেশ এগিয়ে। পাখির মত স্বাধীন জীবন ছিল তাঁর। শিল্পের অন্বেষণ সর্বত্র ঘুরে বেড়াতেন। তিনি সৃষ্টিকে অনুভব করেছিলেন হৃদয় দিয়ে। তাঁর রুদ্রাক্ষের গলার মালা, উঁচু করে বাঁধা খোপা, কপালে তিল, নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব যা কারোরই চোখ এড়াতো না।

অসাধারণ প্রতিভার অধিকারিনী নভেরা আহমেদের সঠিক জন্মসাল নিয়ে যথেস্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে বেশিরভাগ সূত্রে হতে আমরা ধরে নিতে পারি যে, নভেরা আহমেদ তাঁর পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকায় ১৯৩০ সালের ২৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন৷

নভেরার শৈশব কেটেছিল কলকাতা শহরে। কলকাতার লরেটা স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। দেশ বিভাজনের পর তাঁরা কুমিল্লায় চলে আসেন। ১৯৫০ সালে তাঁকে আইন শিক্ষার জন্য লন্ডনে পাঠানো হলে,  শিল্পানুরাগী নভেরার সেখানে গিয়ে প্রথমে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে এবং পরে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে ন্যাশনালে ভর্তি হন। এখানে তিনি ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্স করেন। এরপর তিনি ভাস্কর্যের নগরী ও ইউরোপীয় রেঁনেসার সূতিকাগার ফ্লোরেন্সে যান। সেখানে তিনি দুই- আড়াই মাস ভাস্কর ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে নভেরা আহমেদ দেশে ফিরে আসেন। এবং দেশের মাটিতে তার শিল্প চর্চা শুরু করেন।

নভেরা শিল্পকর্মে নারীকে দেখেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, পুরুষ শিল্পীদের উপস্থাপনার বিপরীতে। ফুটিয়ে তুলেছেন নারীর শক্তিময়ী, জোড়ালো এবং সংগ্রামী প্রকৃত রূপ। লোকজ বাংলার ফর্মের সাথে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয় ঘটান। তাঁর কাজে বারবার ঘুরে আসে পরিবার, সমাজবদ্ধ মানুষের জীবন।

ভাস্কর্য নির্মাণে বিভিন্ন ফর্মের ব্যবহার করতেন। যেমন, মদীয়ানিয় ফর্ম, মহেঞ্জোদার ইত্যাদি। তাঁর প্লাস্টার অব প্যারিসে নির্মিত দু’টি ভাস্কর্যে মুখমন্ডল বহুলাংশে বুদ্ধের মস্তকের অনুকরণ ও সামান্য গান্ধারা শিল্পধারায় প্রভাবিত। তার ভাস্কর্যে হেনরি মুরের কিছুটা প্রভাব ছিল। দেশীয় ভাস্কর্য তৈরিতে তিনি সিমেন্ট বালুর ব্যবহার করেন যা দেখলে একটা মায়ার জন্ম হয়, যে মায়া আমাদের মধ্যে আদিতে ছিল।

ইনার গেজ’ শিরোনামের নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে। মূলত এই প্রদর্শনী নভেরাকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রথম আধুনিক ভাস্কর হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই প্রদর্শনী সম্পর্কে শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদীন বলেছিলেন, ‘আজ এখানে নভেরা যা করছেন, তা বুঝতে আমাদের অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।’

১৯৫৬ সালে নভেরা, শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদীনের সুপারিশে শহীদমিনার নির্মানের কাজের সুযোগ পান। ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে তিনিও শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। পরে অজ্ঞাত কারণে শহীদ মিনারের নির্মাতা হিসেবে তাঁর নামটি সরকারি কাগজে বাদ পড়ে যায়।

নভেরা, তাঁর শিল্প সত্তার প্রতি এই অমর্যাদা মেনে নিতে পারেননি। আর সেই অভিমানে ১৯৬০ সালে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। প্রথমে তিনি লাহোরে যান, সেখান থেকে বোম্বে গিয়ে নাচ শিখেন। তারপর লন্ডন হয়ে প্যারিস। এখানে তিনি গ্রেগরি দ্য ব্রুহনসকে বিয়ে করেন এবং প্যারিস থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে শঁন পামেল গ্রামে বসত গড়েন। আমৃত্যু তিনি এই গ্রামে বসবাস করেছিলেন। এখানে তিনি আত্মীয়-বন্ধু-পরিজনের স্পর্শের বাইরে আলাদা এক জগৎ তৈরি করেছিলেন।

১৯৬১ সালে তাঁর ‘চাইল্ড ফিলোসফার’ ভাস্কর্যটি জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’ পুরষ্কারে ভূষিত করে। কিন্তু তিনি এই পুরষ্কাগুলি গ্রহণের জন্যও কখনোই দেশে ফিরে আসেননি। প্রিয় স্বদেশ থেকে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছানির্বাসন। প্রবাসী জীবন মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু নভেরার যাওয়াটা ছিল হারিয়ে যাওয়ার মত একটা অজ্ঞাতযাত্রা।

নভেরার শিল্প সত্তার কোনো কদর আমরা করতে পারিনি। শহীদ মিনারের স্থাপত্য হিসেবে আজো তাকে আমরা স্বীকৃতি দিতে পারিনি। এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কবি সৈয়দ শামসুল হক একবার বলেছিলেন;“…… হামিদের সঙ্গে আরো একজন ছিলন। হামিদের সঙ্গে ছিলেন কথাটা ভুল, বলা উচিত দু’জনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন। আর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ”।

ভাস্কর্য চর্চা ছিল নভেরার জীবনের ব্রত।  বিদেশের মাটিতেও তিনি তার শিল্পচর্চা চালিয়ে গিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে প্যারিসের গ্যালারি রিভগেসে তাঁর সর্বশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় একশো দিন ব্যাপী এই প্রদর্শনীতে তাঁর ৪২টি চিত্রকর্ম ও নয়টি ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়।কয়েক দশক ধরে অন্তরালে থাকা অভিমানী নভেরা আহমেদ ২০১৫ সালের ৬ মে প্যারিসে নিজের বাড়িতে মারা যান।

নভেরা আহমেদ তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ফারজানা আকসা জহুরা
ফ্রান্স

image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫২
  • ১২:০৭
  • ৪:৪২
  • ৬:৫৪
  • ৮:২০
  • ৫:১৫

ক্যালেন্ডার

July 2020
M T W T F S S
« Jun    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031