নতুন প্রজন্ম মুজিবাদর্শে বেড়ে উঠুক

শনিবার, মার্চ ২১, ২০২০ ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

অতি প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীতে যুগে যুগে কিছু কিছু মানুষ জন্ম লাভ করেছেন যারা বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের কাজের মাধ্যমে মানবজাতির মহাকালের পথে অগ্রযাত্রার কণ্টকাকীর্ণ পথকে মসৃণতর করেছেন। এঁদের কেউ সক্রেটিসের মত নানান তত্ত্ব প্রদান করে মানবজাতিকে কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, কেউ বা নিজের দিগ্বিজয়ী আবিস্কার দিয়ে রোগ-শোক থেকে লাখো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আবার কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা দুঃখী মানুষের ব্যাথায় সমব্যথী হয়ে তাদের মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন এবং হয়েছেন অবিসংবাদী নেতা।

এসকল মানুষ-ই ইতিহাসের পাতায় পাতায় অসাধারণ ব্যক্তিত্ব রূপে চিত্রিত রয়েছেন। তৎকালীন ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে (পূর্ববঙ্গ) ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭মার্চ এমন একজন অসাধারণ ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল, যিনি শুধু এতদাঞ্চলেই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের কাছেই বরণীয় হয়ে আছেন। অজপাড়াগাঁয়ের সন্তান শেখ মুজিব ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু, এরপর জাতির পিতা। আজ তিনি বিশ্ববন্ধু। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি রাজনীতি শুরু করেন। তিনি মুসলিমলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বুঝতে পারেন পৃথক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা সম্ভব নয়। তাই তিনি পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে আন্দোলন করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁর মোহভঙ্গ হয়। তিনি বুঝতে পারলেন, নয়া রাষ্ট্রে বাংলার গরীব-দুঃখী মানুষের মুক্তি হয়নি।

শোষকগোষ্ঠীর তাঁবেদার মুসলীমলীগ ছেড়ে গঠন করলেন আওয়ামী মুসলীম লীগ। এর ধারাবাহিকতায় একসময় তিনি হয়ে উঠলেন বাংলার আপামর জনসাধারণের একমাত্র নেতা। এর কারণ মাত্র একটি, আর তা হল তিনি আজীবন শুধুই সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি কোনভাবেই কখনও মেনে নিতে পারেননি। ভয়, হুমকি, প্রলোভন কোন কিছুই তাকে কখনও টলাতে পারেনি। ফলাফল, ৭০ এর নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট। ইতিহাসে এমন নির্বাচনী ফলাফল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ১৯৭১ সালের ১মার্চ পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চে অনুষ্ঠেয় নির্বাচিত সংসদের অধিবেশন স্থগিত করলে বঙ্গবন্ধু এর প্রতিবাদ করেন এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসহযোগ আন্দোলনের জুড়ি মেলা ভার, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই সকল নাগরিক অংশ গ্রহণ করে। সমগ্র বাংলাদেশের (তৎকালীনপূর্বপাকিস্তান) সাধারণ জনগণের পাশাপাশি বিচারবিভাগ, নির্বাহীবিভাগ, গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবিসমাজ-সহ রাষ্ট্রেরপ্রতিটি বিভাগ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি রাষ্ট্রের সরকারের আনুগত্য অস্বীকার করে তা একজন রাজনৈতিক নেতার হাতে তুলে দেয়। এদেশ বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বে কার্যত ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণতহয়। পাকবাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর ২৬ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা শুধু মাত্র আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সমগ্র বিশ্বের মানুষ; যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর থেকে শুরু করে লন্ডনের ট্যাক্সি চালক পর্যন্ত সকলেই মানচিত্রে এদেশের অবস্থান ভালোভাবে না জানলেও বঙ্গবন্ধুকে চিনতো এবং বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে এদেশকে চিনতো।

এমন অসাধারণ নেতা, যার কথা মনে হলে মনের মধ্যে সমুদ্রের বিশালতা অনুভূত হয়, তাঁর লেখা আত্মজীবনী পড়ে হতবাক হতে হয়। বইটি যখন লিখা শুরু করেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তখন তিনি বন্দী। ততদিনে তিনি জনগণের কাছে বিপুল জনপ্রিয় নেতা। তাঁর দেয়া ছয়দফার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে উঠেছে। এসময়েও জেলখানায় নিজের জীবনী লিখতে বসে তিনি অকপটে স্বীকার করলেন যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয় আন্দোলন করেছেন। তিনি প্রয়োজন হলে অন্যায়ের বিপক্ষে মারপিট করতেন, তরুণ কর্মী হয়েও সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাষানীর মত বড় মাপের নেতা অন্যায্য কিছু বললে বা করলে তার প্রতিবাদ করতেন।

এমন অনেক ঘটনাই তিনি সততা এবং সাহসের সঙ্গে নিজের আত্মজীবনীতে লিখে গিয়েছেন। যেকোন আত্মজীবনীতে নিজেকে নানাভাবে বড় করে উপস্থাপন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু, তিনি কোথাও নিজেকে এতটুকুও বড় করে দেখান নি। পড়লে মনে হয় পাশে বসে কেউ যেন সাবলীল্ভাবে নিজের জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন। সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হয়েও বাংলার জনগণের সাথে সর্বদা তিনি অতি সাধারণ রূপেই মিশেছেন। বঙ্গবন্ধু হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম শুধু বাঙালির জন্য এবং বাঙালি কর্তৃক পরিচালিত একটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। তিনি যে আদর্শ নিয়ে আজীবন সংগ্রাম করেছেন তা হল অতি সাধারণ মানুষের অধিকার সমুন্নত করা। তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে জাতি হিসেবে আমরা কখনও আগাতে পারবোনা। নতুন প্রজন্ম মুজিবাদর্শে বেড়ে উঠুক। বাংলাদেশ তবেই শত সমস্যার বেড়াজাল হতে একদিন মুক্তি পাবে।

লেখক: মাজহারুল হাসান

প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৭
  • ১২:০৬
  • ৪:২৯
  • ৬:১৮
  • ৭:৩৩
  • ৫:৫০

ক্যালেন্ডার

April 2020
M T W T F S S
« Mar    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930