তানজিয়া আহমেদ সাকি’র ছোট গল্প ‘মুক্তি’

তানজিয়া আহমেদ সাকি

শুক্রবার, মে ১, ২০২০ ৩:৫৪ অপরাহ্ণ
গাড়িতে বসে ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে নিজ কর্মস্থল জাতীয় মানসিক হাসপাতালে কখন যে পৌঁছে গেছি খেয়ালই করিনি। ড্রাইভার রতনের ডাকে গাড়ি থেকে নামলাম। আট তলার বামদিকে আমার চেম্বার।লিফটে উঠে সোজা চেম্বারে গিয়ে বসি রোজকার মতো। নিত্যদিনই খানিকটা সময় আগেই চলে আসি চেম্বারে। বাসায় কতক্ষণই বা ভালো লাগে। আমার লাইফ পার্টনার শিহাব তো গত আট বছর আগেই এ জগতের মায়া ত্যাগ করেছে।নিষ্ঠুর মানুষটা রহস্যময় ঐ জগতে কেমন আছে খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার। একমাত্র মেয়েটা ও পোস্ট গ্রেজুয়েশন করতে অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেলো।নিদ্রিতা চলে যাওয়ার পর বাড়িটা বড্ড ফাঁকা লাগে আমার।বিয়ে দিতে চাইলাম।বললো এসে সংসার করবো মা,তোমার মতো।আজীবন স্বাধীনতা দিয়েছি আমি। তাই মেয়ের যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করে মানসিক রোগীদের যন্ত্র‌না লাঘব করেই কেটে যাচ্ছে সময়।
চেম্বারটা আটতলায় হওয়ায় আমার বেশ ভালোই লাগে। নিচের মানুষগুলোকে মিনিয়েচার টাইপ মনে হয়।একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয় মানুষ নয় ,কতগুলো পুতুল হাঁটাচলা করছে।পশ্চিমের দিকটা খোলা। বিশাল আকাশটা দেখা যায়।ঝুম বৃষ্টির পর রোদ উঠেছে এখন। আমি চেম্বারে ঢুকেই পর্দা গুলো সরিয়ে দেই। বিশাল আকাশটার সবটুকু আলো নিজের করে নিই।অন্যান্য মানসিক রোগের ডাক্তারদের চেম্বারের মতো জটিল জটিল হিউমেন ব্রেইনের ছবি আমার চেম্বারের দেয়ালে নেই।কঠিন কঠিন ইংরেজি শব্দ এবং ছবি সংবলিত কোনো পোস্টার ও নেই।আমি কিছুটা সাহিত্যপ্রেমিক। তাই রবী বাবুর “ব্যাধির চেয়ে আধি ই বড়” এই লেখাটাই ডানপাশের দেয়ালে বড় করে সেটে দিয়েছি।
চেম্বারে ঢুকতেই রিসিপসনিস্ট মেয়েটা আমার রুমে ঢুকে কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে।আজও এর ব্যতিক্রম হলো না। আমি এক কাপ কফি পাঠিয়ে দিতে বললাম। কফির কাপটা হাতে নিয়ে আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই।ঠিক তখনি হন্তদন্ত হয়ে এক তরুনী আমার রুমে ঢুকে।ঠিক তার ঢুকে যাওয়ার পর পরই একজন ভদ্রমহিলা!মেয়েটা মহিলাটিকে চিৎকার করে বের হয়ে যেতে বলে।ঘটনার আকস্মিকতায় আমি চমকে গেলে ও সামলে নিই।কারন এ ধরনের কেস ও আমাকে হ্যান্ডেল করতে হয়।ততক্ষণে রিসিপসনিস্ট মেয়েটা ও রুমে ঢুকে।আমি ভদ্রমহিলাকে লক্ষ্য করে বললাম
আপনি আসুন।আমি আপনাকে সময় মতো ডেকে নিব।ভদ্রমহিলা বের হয়ে গেলে আমি মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি।শ্যামলা বরন চেহারায় কী অদ্ভুত একটা মায়া।গোলাপি রংয়ের হাতের কাজের সালোয়ার কামিজে আর ও মায়াবতী লাগছে।চুলগুলো এলেমেলো কিন্তুু এতে ওকে আরও সুন্দর লাগছে।বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই মেয়েটা মানসিক রোগী!মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলাম,
নাম কী তোমার?তুমি করে বলছি কিন্তুু তোমায়…
ঝুমুর।
ঝুমুর কোথায় পড়াশোনা করো?
পড়াশোনা! !আমার মা আমাকে বন্দি করে রাখছে গত দু বছর!!আপনি বলছেন পড়াশোনা!!…শুনবেন আমার কথা গুলো ধৈর্য্য নিয়ে?মা তো বলতে দেন না!
অবশ্যই শুনবো। ওটাই তো আমার কাজ। তুমি বলো।
আমি আমার বাবাকে মেরে ফেলেছি!
কথাটা শুনে আমি মেয়েটির চোখের দিকে সরাসরি তাকাই।তৃপ্তির একটা ঝিলিক তার চোখে বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো যেন নেচে উঠলো।
মেরে ফেলেছো?কীভাবে বলো তো?
বাবা জনকন্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন।মোটর বাইকে এক্সিডেন্ট করে দু টা পা ই হারান।এরপর থেকে জীবনটা বদলে যায় আমাদের। বাবা হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে গেলেন।আর মা তখন সানিডেল স্কুলের নামকরা শিক্ষিকা।যতদিন যেতে লাগলো বাবা আর মায়ের দূরত্ব বাড়তেই থাকলো।ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন মাত্র।কিন্তুু মায়ের সাথে দূরত্ব বাড়লেও বাবার সাথে আমার বন্ধুত্ব দিন দিন বেড়েই চললো।আমরা ততদিনে ধানমন্ডিতে নানুবাড়ি দোতলায় গিয়ে উঠেছি।স্কুল থেকে ফিরেই বাবার সাথে রান্না করি।একসাথে দুপুরের ভাত খাই।নানু ও আমাদের সাথে যোগ দেয়।কিন্তুু আমাদের এই আনন্দযজ্ঞে যোগ দিতে পারে না কেবল মা।চারটায় স্কুল থেকে ফিরে মা ক্লান্ত শরীরে নিজের ঘরে চলে যায়।বাবা আমি ডাকার সাহস পাই না।ইচ্ছে হলে সন্ধ্যায় আমাদের সাথে চা খান না হলে নিজের ঘরে স্টুডেন্টস দের খাতা দেখেন।বাড়ি ভাড়াটা বেঁচে গেলে ও সংসারের অন্যান্য খরচ তো বাড়তেই থাকে।নানু ও একা।মামারা দুজনই বিদেশে সেটেলড।নানা ও নাই।সুতরাং নানুকে দেখার দায়িত্ব ও মার ওপর ।মা আস্তে আস্তে বাসায় স্টুডেন্টস পড়াতে শুরু করলেন।এখন মা আর ও ব্যস্ত।সামান্য কারনেই বাবার সাথে ঝগড়া।খোঁটা দিয়ে কথা বলা।নানু মাঝে মাঝে দু এক কথা বোঝাতে গেলে ও মার কাছে পরাজিত হউন সবসময়।বাবাকে নিরবে কতদিন যে আমি কাঁদতে দেখেছি।রাতের পর রাত মায়ের ঘরে উঁকি দিতে দেখেছি।আর বাবার মুখের উপর মার দরজা লাগানোর শব্দ শুনেছি।এই অসুস্থ পরিবেশটা সবচেয়ে ক্ষতি করলো আমার।আমি ও রাতের পর রাত কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতাম।এভাবে নাইনে উঠেই তিন বিষয়ে ফেল করলাম।মা সেদিন খুব মেরেছিলেন।বলেছিলেন পারলে মরে যা…আমার ও খুব ইচ্ছা হচ্ছিল যদি মরে যেতে পারতাম…
এটুকু বলে থামে ঝুমুর।কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে খুব।আমি পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিই ওর দিকে।পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করে আবার…
বাবা অদ্ভুত ভালো গান করতেন।হারমোনিয়াম দিয়ে আমাকে বাবাই গান শেখানো শুরু করেছিলেন।কোনো কোনো দিন সকালে বাবা দরাজ কন্ঠে গাইতেন,”আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি”।আমি অংক করতাম আর বাবার গান শুনে কাঁদতাম।বাবা সারাদিন বাসায় বসে পত্রিকা পরতেন।নিজের লেখা আর্টিকেল গুলো আমাকে পড়তে দিতেন।আমি ও কীভাবে কীভাবে যেনো এসএসসি তে এ+ পেয়ে যাই।বাবা কী যে খুশি হউন!!নানু ততদিনে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।মা এখন আর ও একা।কিন্তুু তবু ও আমাদের সাথে তার যোজন যোজন দূরত্ব। বাবার সাথে সাথে আমাকে ও প্রায়ই খোঁটা দিয়ে নানা কথা বলে ফেলেন।বাবা খুব মুষড়ে পড়েন যেদিন আজিজ আঙ্কেলকে দেখেন মা কে লিফট দিয়ে বাসা পর্যন্ত নামিয়ে দিতে।এবং এটা প্রায়ই হতো।বাবার এই পঙ্গুত্ব এই অসহায়ত্ব আমাকে শেষ করে দিচ্ছিলো।মা বের হয়ে গেলে আমি বাবাকে প্রায়ই বলতাম চল বাবা দূরে কোথাও পালিয়ে যাই মা কে ছেড়ে।বাবা চোখ মুছে বলতো,বুড়ি তোর মা কে যে বড্ড ভালোবাসি।কী করবে এই বিশাল পৃথিবীতে ও একা একা!!তোর মা একদিন ভুল বুঝবে দেখিস!
কিন্তুু না মা ভুল বুঝেননি।বাবার সাথে মায়ের একদিন অসম্ভব ঝগড়া হয়।একপর্যায়ে মা বাবার হুইলচেয়ারটায় সজোরে ধাক্কা দেন।বাবা পড়ে যান।আমি গিয়ে মা র হাতটা মুচড়ে ভেঙে দিচ্ছিলাম প্রায়….বাবা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন বুড়ি তোর মা কে ছেড়ে দেয়…
ঝুমুর এবার ঢুকরে কেঁদে উঠলো।আমি টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু ওর হাতে দিলাম।
এরপরই সেই আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত টা নিলাম।কলেজ থেকে ফেরার পথে কড়া ডোজের ডায়াজিপাম কিনে আনলাম।সকালে চায়ের সাথে দুইটা,বিকেলে কফির সাথে তিনটা…এভাবে আটটা ঔষুধ পরপর দুইদিন বাবাকে খাইয়ে দিলাম।ডায়াবেটিস হাইপ্রেশার আর পায়ের যন্ত্রনায় বাবা অনেকটাই বিধ্বস্ত ততদিনে।কড়া ডোজের ঘুমের ঔষুধ বাবা নিতে পারবেন না আমি জানতাম।হুইলচেয়ারই বাবা লুটিয়ে পড়লেন।
মা র সাথেই তো যত সমস্যা তোমাদের। মাকে না মেরে বাবাকে মেরে ফেললে কেনো ঝুমুর?আমি প্রশ্ন ছুড়ে দেই।
বাবা তো ভুল করেননি।বাবা মা কে ভালোবাসতেন খুব।মা পারেনি বাবাকে ভালোবাসতে।তাই বাবারই মুক্তির প্রয়োজন ছিলো।মা কে মেরে ফেললে বাবা কখনোই ভালো থাকতে পারতেন না।আমি তাই বাবাকেই মুক্তি দিয়েছি।মা আমাকে পুলিশের কাছে না দিয়ে মানসিক রোগের ডাক্তারদের কাছে নিয়ে ছুটছে গত দুবছর।আপনার কী মনে হয় আমি মানসিক রোগী?বলুন?বলুন…বলেই চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো ঝুমুর…আমি দ্রুত উঠে গিয়েওর হাতটা ধরে রিসিপসনিস্ট মেয়েটা কে ডেকে ওকে কেবিনে নিয়ে যেতে বলি।ঘুমের ইনজেকশন প্রয়োজন ওর…সিস্টারকে রেডি করতে বলি…ওর কেস স্টাডির ফাইলটা দেখি..ওর মায়ের সাথে কথা বলতে হবে..রৌদ্র উজ্জ্বল আকাশটা ততক্ষণে আবার মেঘে ঢেকে গেছে। ভীষন ঝড় হবে মনে হচ্ছে।মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেলো আমার।নিদ্রিতাকে বড্ড মনে পড়ছে এখন….(সমাপ্ত)
image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৪
  • ১২:০৭
  • ৪:৪৩
  • ৬:৫৩
  • ৮:১৮
  • ৫:১৮

ক্যালেন্ডার

July 2020
M T W T F S S
« Jun    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031