ছোট গল্প ‘যাত্রা’ || নওরীন সাজ্জাদ 

রবিবার, জুন ১৪, ২০২০ ৮:০৩ অপরাহ্ণ
অযথা কথা বলা একদম পছন্দ করেনা সপ্ন। অবশ্য বিষয়টা সপ্ন ময়ের কাছ থেকেই পেয়েছে। সারাদিন নিজের মতো খেলতে থাকে কারণ এবাসায় একমাত্র বাচ্চা ওই। বাসার সবার আদর আহ্লাদে বড় হওয়া বাচ্চাগুলো যেমন একরোখা হয় সপ্ন মোটেও তেমন না। যথেষ্ট শান্ত, অযথা কোন বায়না করেনা, কাউকে বিরক্ত করেনা, কোন কান্নাকাটি নেই, চেচামেচি নেই একদম নির্ভেজাল ভদ্রবাচ্চা। শুধু একটাই বদ অভ্যাস ওর, দাত দিয়ে নখ কাটা। এই একটা কারণেই মায়ের বকা খায় সে, তবু্ও অভ্যাসটা ছাড়তে পারেনা। বড়চাচি সবসময়ই বলে “দেখবি আর কয়টাদিন পরই এই মোটা ফ্রেমের চশমা পরতে হবে তোকে”। সপ্ন মুচকি মুচকি হাসে বড়চাচির কথা শুনে।
দুপুরে সপ্ন বড়চাচির সাথে ঘুমায়। বড়চাচির তুলতুলে শরীর জরিয়ে শুয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে ওর। সবচেয়ে ভালো লাগে চাচি যখন কুটুর কুটুর করে গল্প করে। ওর তখন মনেহয় ও যেন ৫ বছরের কোন বাচ্চা নয়, অনেক বড় একজন। যেন চাচি তার কোন বন্ধুর সাথে গল্প করছে। কোন কোন দিন মায়ের থেকেও বড়চাচিকে আপন মনেহয় সপ্নর। কিযে আদর করে চাচি ওকে সপ্নপাখি বলে ডাক দেয়, সপ্নর ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে চাচির গলা জড়িয়ে ধরে কিন্তু কেমন যেনো লজ্জা লাগে। মা কখনোই ওকে পাখি বলে ডাকেনা। মা সবসময় ওকে নাম ধরেই ডাকে, কখনও তুই করে কথা বলেনা, বেশি আহ্লাদ করেনা, রাতে যদি কখনও সপ্ন মাকে জরিয়ে ধরেছে তো মা গম্ভীর গলায় বলে “সরে ঘুমাও সপ্ন”। বাবা কিন্তু একদম আলাদা। বাবা কখনও সপ্নকে নাম ধরে ডাকেনা, বাবা ডাকে আম্মুই। অফিস থেকে ফিরেই “আমার আম্মুইটা কইরে” বলেই এক চিৎকার দেয়। সপ্ন হাসিমুখে বাবার কাছে যায়। বাবা আর বড়চাচা প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার সময় ওর জন্য কিছুনা কিছু নিয়ে আসে। বিশেষ করে চাচা। বাবার হয়তো কোনদিন ভুল হয় কিন্তু বড়চাচা কোনদিন খালি হাতে বাসায় ফেরেনা। বিষয়টা মজাই লাগে সপ্নর, প্রতিদিন মনে মনে আন্দাজ করে আজ কে কি নিয়ে আসবে, মাঝে মাঝে আবার মিলেও যায়। মা কিন্তু বিষয়টা একদম পছন্দ করেনা। মা এটা নিয়ে প্রায়ই বাবাকে বকা দেয় কিন্তু বড়চাচাকে কিছুই বলেনা। মাঝে মাঝে কেবল হাসিমুখে বলে “আপনারা তো মেয়েটাকে নষ্ট করে দেবেন ভাইয়া”। বড়চাচাও সাথে সাথে উত্তর দেয় “আরে একটামাত্র বাচ্চা বাসায়, ওর জন্য কিছু না নিয়ে ক্যামনে বাসায় ফিরি মিরা বলোতো?” মা আর চাচার কথা শুনে দাদি বলে “আহা তুমি রাগ কর কিজন্য মিরা? সপ্নতো আর কারো কাছে কিছু চায়না। ওর বাপ চাচা আনন্দ পায় মেয়ের জন্য কিনাকাটা করে, পাক না”। মা আবার হাসে “চাইবে কখন মা? ওরা চাওয়ার সুযোগ দেয়?” সপ্নকে নিয়ে যখন সবাই একসাথে কথা বলে তখন ওর খুব ভালো লাগে। নিজেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। অবশ্য এই বাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গুরুগম্ভীর ব্যক্তিটি যে সে নিজে এটা সপ্ন ভালোই বোঝে।
পড়াশোনায়ও সপ্ন ভীষণ মনযোগী। স্কুলের অন্যতম শান্ত ছাত্রী। ওর স্কুলের সব টিচাররা ওকে খুব পছন্দ করে। কেন করবেনা? এমন শান্ত, মনযোগী ছাত্র ছাত্রী পাওয়া খুবই মুশকিল আজকাল। সকালে মা অথবা বাবা সপ্নকে স্কুলে দিয়ে আসে আর ছুটির পর মা ওকে নিতে যায়। কিন্তু মাঝেমধ্যে স্কুল ছুটির পর যখন বড়চাচিকে ওর জন্য অপেক্ষা করতে দেখে সেদিন সপ্ন খুবই খুশি হয়, কারণ বড়চাচি ওকে নিয়ে সোজা বাসায় ফেরেনা, কখনও কোন দোকানে গিয়ে কিছু খায় আবার কখনও শুধু রিকশা নিয়ে একটু ঘুরে ফিরে তারপর বাসায় যায়।
বড়চাচি : সপ্ন আইসক্রিম খাবি?
সপ্ন : নাহ, মা বকবে।
চাচি : আরে, কে বলবে তোর মাকে? তুই? (মুচকি হাসি)
সপ্ন : খাবোনা চাচি।
চাচি : আচ্ছা যাহ, আমি খাব তুই তকিয়ে তাকিয়ে দেখিস অকে? এইকথা বলে চাচি দুটো আইসক্রিম কেনে তারপর দুজন মিলে আইসক্রিম খেতে খেতে বাসায় রওনা দেয়। মাকে ওরা যতই না বলুক মা কিন্তু ঠিকই বুঝে যায় “ আজ কি খেয়ে বাসায় ফিরলে ভাবি? আইসক্রিম নাকি পিৎজা?” চাচি হাসতে হাসতে জবাব দেয় “তোমারে তো বলা যাবেনা, এইটা আমাদের সিক্রেট”। মা হাসে চাচিও হাসে আর সবচেয়ে বেশি হাসে দাদি। নিজেকে নিয়ে সবার এই আগ্রহ দেখতে কিযে ভালোলাগে ওর। একদিন মায়ের শরীর খারাপ থাকায় বাবা গেলো সপ্নকে স্কুল থেকে আনতে। সেদিন ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো । কিছুক্ষণ চুপচাপ স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে বাবা আস্তে আস্তে বলল “ইস তোর মা কতোবার বলল ছাতাটা নিয়ে আসতে!” সপ্নর খুবই ইচ্ছা করছিলো বৃষ্টিতে ভিজতে কিন্তু কিছুই বললনা ও বাবাকে।
বাবা হঠাৎ বলে “চল আম্মুই, আজকে আমরা ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরি”।    সপ্নর যে কি মজা লাগলো, কিন্তু বলল “মা যদি বকে?”
বাবা : আরে, তোর মাতো শুধু শুধুই বকা দেয়। আর বকাতো তুই খাবিনা, খাবো আমি।
সপ্ন : আমিতো তোমাকে বকা দেওয়ার কথাই বলছি বাবা (দুজনেই হাসতে থাকে)। সেদিন কি কাকভেজা হয়েইনা বাসায় ফিরেছিলো ওরা। মা এমন রাগ করল যে একটা কথাও বালেনি বাবার সাথে। বড়চাচি দৌড়ে একটা তোয়ালে দিয়ে ওকে পেচিয়ে বাথরুমে নিয়ে গেলো “কি কর এগুলা শাহেদ? জর না এসে যায় মেয়েটার।
বাবা : (লাজুক হেসে) এতো ভয় পাও কেন ভাবি? একটু আকটু বৃষ্টিতে না ভিজলে পোলাপান স্ট্রং হয়?
চাচি : হু আসছে, খুব স্ট্রং হবে জর বাধিয়ে। যাও ওর মার হাতে মাইর খাও এখন গিয়ে। চাচি বাবা দুজনেই হাসতে থাকে। মা শুধু দুরে দাঁড়িয়ে ওদের কথপোকথন শোনে আর কটমট করে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেদিন যেইনা একটা হাচি দিয়েছে সপ্ন, দাদি তাড়াতাড়ি সরিসার তেল গরম করে ওর বুকে পিঠে মালিশ করে দেয়, চাচি গরম গরম চকলেট মিল্ক বানিয়ে ওকে খেতে দেয় আর মা খালি রাগী চোখে বাবার দিকে তকায়। বাবা বলে “আরে কি শুরু করলা তোমরা? মাত্রতো একটা হাচি দিলো”। দাদি রাগী গলায় বলে “চুপ কর গাধা। শাহীন আসুক আজকে, তোরে এমন গাইল দিবে দেখিস”। সপ্ন ঠিকই বোঝে চাচা বাবাকে কিছুই বলবেনা। বড়চাচা অফিস থেকে ফিরলেই সপ্ন দৌড়ে তার কাছে গিয়ে বলে “চাচা তুমি বাবাকে বকবে?”
চাচা : (অবাক হয়ে) কেন মা? বাবা তোমাকে বকা দিয়েছে নাকি?
সপ্ন : (কিছুটা ভয় পেয়ে) উহু, আজকে আমি আর বাবা বৃষ্টিতে ভিজেছিতো তাই সবাই অনেক রাগ করেছে। তুমিও রাগ করবে?
চাচা : কি? (রাগ করে) অবশ্যই বকা দেব তোর বাবাকে। ডাক দেখি ওকে, আমাকে রেখে তোরা কিভাবে পারলি ভিজতে? (হা হা করে হাসতে থাকে)। সপ্ন প্রথমে মন খারাপ করে পরে চাচার দুষ্টুমি বুঝতে পেরে তার পেটে হালকা করে ঘুষি মারে। চাচা আদর করে ওকে কলে তুলে নেয়। এইবার চাচাও বকা খায় দাদির কাছে আর সপ্ন শুধু মজা পায় তার পরিবারের সবার কান্ডকারখানা দেখে।
একদিন দুপুরবেলা সপ্ন বড়চাচির গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে আর চাচি তার চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে নিচু স্বরে কথা বলছে। হঠাৎ চাচি সপ্নকে জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা মা বলতো, তোর যদি একটা ভাই অথবা বোন থাকতো তাহলে কেমন হতো?” এধরণের প্রশ্ন কেউ কখনও সপ্নকে করেনি তাই সে কিছুটা অবাক হয়। চাচি কেন ওকে একথা বলছে? ওর বন্ধু সিনথিয়ার একটা ছোট ভাই আছে। তাকে মাঝে মাঝে স্কুল ছুটির সময় সিনথিয়ার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছে সপ্ন, ভালোই লাগে যখন সিনথিয়াকে দেখেই ও দৌড়ে কাছে আসে, দুজনের হাত ধরে হাটতে হাটতে যায়। কিন্তু ওর নিজের একটা ভাই বা বোন থাকলে কেমন হতো একথা সপ্ন কখন চিন্তাই করেনি।
বড়চাচি : কিরে কথা বলছিস না কেন?
সপ্ন : কিজানি!
চাচি : কিজানি আবার কি? শোন, আমরা অনেক চিন্তা করে দেখলাম তোর যদি একটা ভাইবোন হয় তাহলে আর তোকে একা একা খেলতে হবেনা। ভালো হয়না সেটা? (চাচি মুচকি হাসে)
সপ্ন : কিন্তু আমার সাথে তো তুমি, দাদি, বচ্চাচা, বাবা সবাই খেলা কর বচ্চাচি। (সপ্ন আদুরে কন্ঠে বলে)
চাচি : আমারতো বড়, যদি পিচ্চি একটা মানুষ থাকে যে তোকে আপু বলে ডাকবে, তোর সব কথা শুনবে, তাহলে আরও ভালো হয়না? সপ্ন কিছুই বলেনা। চুপচাপ চাচির দিকে তাকিয়ে থাকে।
চাচি : এজন্য আমরা চাচ্ছিলাম যেন তোর একটা ভাই অথবা বোন নিয়ে আসতে। এবং সে আর কয়েক মাসের মধ্যে চলেও আসবে। (চাচি আবার মুচকি হাসে) সপ্নর চোখে ওর মায়ের পরিবর্তনটা এর আগে ধরা পড়েনি। এখন ও বুঝতে পারে যে কেন চাচি ইদানিং মাকে কোনো কাজ করতে দিতে চায়না। বারবার শুধু খেতে বলে। মাকে ইদানিং একটু মোটা মোটা মনে হয় ওর। এখন মা আর ওকে স্কুলে নিয়ে যায়না বা স্কুল থেকে আনতেও যায়না। বাবা সপ্নকে স্কুলে দিয়ে তবে অফিসে যায় আর চাচি ওকে ছুটির পর নিয়ে আসে বাসায়। বিষয়টা আগে খেয়াল করেনি সপ্ন, এখন চাচির কথা শুনে ও বুঝতে পারে। চাচি ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খায় “কিরে মা, তোর কি মন খারাপ হলো? কথা বলছিস না কেন?”
সপ্ন এক লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে “খুব মজা হবে চাচি, বেবি কবে আসবে?”
চাচি হাসতে হাসতে বলে “লক্ষি মাপাখি, খুব তাড়াতাড়ি ই আসবে”।
প্রথম প্রথম এই খবর শোনার পর একটুখানি মনখারাপ ঠিকই হয়েছিল সপ্নর, কিন্তু ধিরে ধিরে ও বুঝতে পারে আসলে বিষয়টা মজার। চাচি ওকে বলেছে বেবিকে সবার আগে সপ্নই কোলে নেবে, বেবির নামও ওই রাখবে। খুব মজা হবে খুউউউউব।
কিন্তু এর মাঝেই কিযেন একটা অসুখ এলো। সপ্নর স্কুল বন্ধ, বাবা চাচার অফিস ও বন্ধ। সারাদিন বাবা আর চাচা টিভিতে খবর দেখে আর গম্ভীর গলায় কথা বলে। মা, চাচি আর দাদি ওকে আগের চেয়েও বেশি বকা দেয় মুখে হাত দিলে। সারাদিন সবাই শুধু সাবান দিয়ে হাত ধুতে বলে। দাদি আগের চেয়েও বেশি বেশি নামাজ পড়ে। এদিকে মায়ের শরীরটাও দিন দিন ভারি হয়ে যাচ্ছে। মাকে নিয়ে সবাই খুবই চিন্তায় আছে, হাসপাতাল নাকি এখন সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা। অথচ কয়েকদিনের মধ্যেই মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সপ্ন মানুষটা ছোট হলেও সবার এই চিন্তিত চেহারা দেখে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা হলেও আচ করতে পারে। এর মাঝেই একদিন বড়চাচার পেটের উপর শুয়ে তার মোবাইল দিয়ে গেম খেলছিল সপ্ন। চাচি এসে ওকে হাত ধরে টেনে তুলতে গিয়েই বলে উঠলো “এই দেখতো, ওর গা গরম মনে হচ্ছে”। চাচা তড়িঘড়ি করে উঠে বসে ওর কপালে হাত দিলো। চাচার কপালটা কুচকে গেলো সাথে সাথেই “তাড়াতাড়ি শাহেদকে ডাকোতো। আর শোনো, এখনই  মিরাকে বইলোনা কিছু”। চাচি দৌড়ে গেলো বাবাকে ডাকতে।
চাচা : মামনি, তোর কি কাশি হয়েছে আজ? গলা খুশখুশ করছে?
সপ্ন : তাতে কি হয় বচ্চাচা?
চাচা : লক্ষি মা আমার, ঠিকমতো বলতো আমাকে।
সপ্ন : দুই একটা কাশি মনেহয় দিয়েছি। (সপ্ন লাজুক হাসে যেন কাশি দেওয়া বিরাট কোন অপরাধ)।
বাবা : কি ব্যাপার ভাইয়া, ডাকছো আমাকে?
চাচা : (চাচির দিকে রাগ করে তাকিয়ে) মেয়েটার যে জর, গলাব্যথা, তোমরা কেউ কেনো খেয়াল করোনি?
চাচি : আহা, চিৎকার কোরোনা, মিরা শুনতে পাবে।
সেদিনের পর থেকে সপ্ন আলাদা একটা ঘরে আছে। একদিন মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাদা পোশাক পরা দুজন মানুষ এসে ওর গলার ভেতর কিযেন একটা কাঠি ঢুকিয়ে খানিকটা লালা নিয়ে গেছে। তারপর দিন ও বাসার ভেতর থেকে জোরে জোরে কান্নার আওয়াজ পেয়েছে। সপ্নর জন্মের পর এবাসায় কেউ কখনও কাদেনি, অন্তত সপ্ন কাউকে কাদতে দেখেনি। কি অদ্ভুত! সবাই এতো কাদছে কেন?
অন্য কেউ যখন ওর ঘরে আসে, মুখে মাস্ক পরে আসে। বাবা খালি পায়চারি করে ঘরের সামনে। বড়চাচি ওকে খাইয়ে দিয়ে যার। যতক্ষণ চাচি থাকে বারবার চোখ মুছতে থাকে। দাদির উচ্চকণ্ঠের কোরান তেলাওয়াতের আওয়াজ পায় সপ্ন। বড়চাচা এসে এমন ভাব করে যেনো কিছুই হয়নি সপ্নর। কিন্তু মা কখনও আসেনা। সপ্নর কিন্তু খুব একটা মন খারাপ লাগেনা। শুধু মাকে দেখতে ইচ্ছে করে। মাকে ছাড়া রাতে ঘুমাতে ভিশন কষ্ট হয় ওর। কিন্তু কি আর করার, বচ্চাচা বলেছে “আর মাত্র কয়টাদিন ওকে একলা থাকতে হবে ব্যাস”। কিন্তু দিন যে যেতেই চায়না!
পরদিন চাচি সকালের নাশতা নিয়ে এসে দেখে সপ্নর ছোট্ট বুকটা যেন একটু বেশিই ওঠানামা করছে। চাচি হাউমাউ করে কাদতে কাদতে চিতকার করে বলে “এম্বুলেন্স খবর দাও, তাড়াতাড়ি”।
 এম্বুলেন্স এর স্ট্রেচারে শুয়ে মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে সপ্ন। ওদের একতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এম্বুলেন্স। বাবা ডাক্তার এর সাথে কথা বলছে। দাদি বচ্চাচাকে জড়িয়ে ধরে অনবরত কেদেই চলছে। আর চাচি মাকে আটকে রাখতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। দুজনেই কাদছে সমানে। মায়ের মোটা অসুস্থ শরীরে যত শক্তি আছে তার সবটুকু দিয়ে সে ছুটে আসতে চাচ্ছে সপ্নর কাছে, “ভাবি ছাড় আমাকে, আমার সপ্ন, আমার সপ্ন” মায়ের আহাজারি শুনতে পায় সপ্ন। সপ্ন কি করবে বুঝতে পারেনা। সবাই এমন কেন করছে? ও তো সুস্থ হয়েই আবার বাসায় চলে আসবে। বেবির নামটাও ঠিক করতে পারলোনা এখনো। বেবির জন্য ওর নিজের যে খেলনাগুলো আলাদা করে রেখেছিলো, সেগুলো কোথায় রেখেছে তা এখন আর মনে করতে পারলোনা। থাক, বাসায় ফিরে খুঁজে দেখলেই হবে। আরে ডাক্তার তো বাবাকে বললই “ভাই আমার ও বাচ্চা আছে ওর বয়সি, আপনারা একটু স্থির হন। আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো” সপ্নর খুব আফসোস হতে থাকে কেনোযে ও সবার কথা শুনে মুখে আঙুল দেওয়া বাদ দিলোনা! বড়চাচা আর বাবা এম্বুলেন্স এ উঠে বসল। মা এখনো চিৎকার করেই যাচ্ছে। কেউ কেনো মাকে থামাচ্ছেনা? এমন অসুস্থ শরীরে এতো কান্নাকাটি করলে চলে?
এম্বুলেন্স চলতে শুরু করল। শুরু হলো সপ্নর যাত্রা। অননুমেয় অনিশ্চিত যাত্রা।
লেখক: সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রভাষক, থিয়েটার এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ,ঢাকা।
image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:১১
  • ১২:০৮
  • ৪:৪১
  • ৬:৪২
  • ৮:০২
  • ৫:২৯

ক্যালেন্ডার

August 2020
M T W T F S S
« Jul    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31