করোনাকাল ও আমাদের আত্মোপলব্ধির দারিদ্র্য

মো. শহিদুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২০ ২:২০ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস (Covid-19) সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে নৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অস্তিত্ববাদী সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষের এই অসহায়ত্ব যে মহান দার্শনিকের নামটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তিনি হলেন কার্ল মার্ক্স। মার্ক্স ছিলেন এমন একজন দার্শনিক যিনি মানব সমাজের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে স্বীয় বস্তুবাদী বক্তব্য পেশ করেছিলেন, কল্পনা প্রসূত কোন কথা বলেননি। এজন্য মার্ক্সের দর্শনকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বা বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ নামে অভিহিত করা হয়। মার্ক্স ছিলেন এমন একজন দার্শনিক যিনি সমাজে সাম্যবাদের নীতিতে প্রতিষ্ঠিত ন্যায্যতার কথা বলেছিলেন।
যে কথাটি বলতে চাই তা হল সাম্যবাদ কথাটি শুনলেই আমরা ভয় পেয়ে যাই। মনে করি এই বুঝি রাষ্ট্র আমার সব সম্পত্তি নিয়ে নিল। যেমন ধরুন, একটা রাষ্ট্রে ১০ জন মানুষ আছে এবং এর মধ্যে একজনের কাছে ৫০ টাকা, আরেকজনের কাছে ৩০ টাকা, এবং বাকি ৮ জনের কাছে আরো বিভিন্ন পরিমানে মোট ২০ টাকা আসে। তাহলে এই সমাজের মোট সম্পত্তি হলো ১০০ টাকা। আমরা সাম্যবাদী রাষ্ট্র বলতে মনে করি, রাষ্ট্র মনে হয় এই ১০ জনের কাছ থেকে সব টাকা নিয়ে নিবে এবং যোগ্যতা বিবেচনা না করে সবাইকে ১০ টাকা করে মোট ১০০ টাকা দিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে। এটা সাম্যবাদ সম্পর্কে মারাত্মক ভুল ধারণা। মার্ক্সবাদী সাম্যবাদ ন্যায্যতার কথা বলে। তবে এখানে মার্ক্স ন্যায্যতা বলতে এমন এক সমাজের কথা বলেছেন যেখানে মানুষ জীবন ধারণের জন্য মজুরির বিনিময়ে অন্যের নিকট তার শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য থাকবে না, বরং নিজের শ্রম ও উৎপাদনের উপর শ্রমিকের নিজের অধিকার থাকবে। এটাই হলো ন্যায় ও মানবিক, অন্যথা হল অন্যায় ও অমানবিক।
শ্রম, মজুরি, অন্যায়, অমানবিক কথাগুলো শুনে আমাদের চোখের সামনে দিনমজুর আর গার্মেন্টস কর্মীদের ছবি ভেসে আসছে, তাইনা? আসাটাই স্বাভাবিক, কারণ তারাইতো দিনমজুর তারাইতো মজুরির বিনিময়ে শ্রম বিক্রি করে। ভাই, আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করব : আপনিও কি মজুরি শ্রমিক নন? আপনিও কি জীবন ধারণের জন্য শ্রম বিক্রি করেন না। পার্থক্য হলো, আপনি কোট – টাই পরে অফিসে যান এবং মাইনেটা দৈনিক না নিয়ে মাস শেষে নেন। কিন্তু প্রতিদিন যে কাজটা আপনি করে যাচ্ছেন সে কাজে আপনার কোন আনন্দ নেই, গর্ব নেই, উচ্ছ্বাস নেই। কেন জানেন? কারণ আপনি সারাদিন পরিশ্রম করে যা উৎপাদন করেন সেই উৎপাদিত ফসলের সাথে আপনার প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্ক নেই। কারণ আপনি মজুরে শ্রমিক, জীবন বাচাতে মজুরির বিনিময়ে অন্যের জন্য কাজ করেন। এই মজুরী ভিত্তিক শ্রম ও সমাজকেই মার্ক্স অন্যায্য ও অমানবিক বলেছেন। এখন ভেবে দেখুন, আমাদের বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা আমাদের সাথে কতটুকু ন্যায্য ও মানবিক আচরণ করছে।

আমি জানি, বারবার মার্ক্স, সমাজতন্ত্র এই শব্দগুলো শুনে আপনি বিরক্তি বোধ করছেন। বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ এই শব্দদুটি আপনাকে বারবার বাংলাদেশের তথাকথিত শ্রমিক নেতা এবং মার্ক্সবাদী ইনু, মেননদের রাজনীতি ও কার্যক্রম মনে করিয়ে দিচ্ছে। ভাই আপনাকে বলবো, মার্ক্সীয় সাম্যবাদী ধারণা বুঝাতে গিয়ে যদি আমরা বাংলাদেশের শ্রমিক নেতাদের উদাহরণ দিই, আর মার্ক্সবাদী বলতে যদি মেনন, ইনু এদেরকে বুঝি তাহলে বলতে হবে আমরা মার্ক্সকে বুঝতে ভুল করছি।
অনেকেই বলেন, সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে খারাপ দিকটা হল এখানে কোন ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই। রাষ্ট্রই (নেতা) চরম ক্ষমতার অধিকারী। আমি বলবো এরকম ঢালাও ভাবে বললে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আসলে সমাজতন্ত্র বলতে আমরা সোভিয়েত ইউনিয়ন, উত্তর কোরিয়া কিংবা চীন কে বুঝে থাকি, এই জন্যই এধরনের ভুল হয়। বস্তুত, মার্ক্স ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে বুঝিয়েছেন নিজের শ্রম ও উৎপাদনের উপর শ্রমিকের নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এবার বিবেচনা করে দেখেন, পুঁজিবাদ কি শ্রমিকদের এই অধিকার দিয়েছে। উপরন্তু, মজুরীর বিনিময়ে পুঁজিবাদ মানুষের মত জীবন্ত সত্বাকেও যন্ত্রের মতো বিবেচনা করে, ব্যবহার করে। তাহলে এখানে কি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা মানবিক মর্যাদা বলে কিছু থাকলো? বর্তমানের বাংলাদেশ দেখেন প্রমাণ পেয়ে যাবেন।

আপনি হয়তো বলবেন সমাজতন্ত্র বলতে আমরা স্টালিন’র সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা মাও সেতুং’র চীন কে বুঝে থাকি,কারন এটাই আমরা বাস্তবায়িত হতে দেখেছি। হতে পারে মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রই আদর্শ সমাজতন্ত্র কিন্তু সেটা তো কল্পনাপ্রসূতই থেকে গেল। আমি বলবো মার্ক্স সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বরূপ কেমন হবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি। এজন্য কয়েকটি রাষ্ট্র নিজের মতো করে সমাজকে সাজিয়ে নাম দিয়েছে মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্র। আপনার সাথে আমি একমত যে সমাজতন্ত্র বললে প্রথমেই আমরা সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা চীন কে বুজবো এটাই স্বাভাবিক। তবে মার্ক্সবাদ কল্পণাপ্রসূত রয়ে গেল কিনা একথা বলার সময় এখনো হয় নি বলে আমার মনে হয়। কারণ ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে সময়ের বিবেচনায় ১৫০ বছর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য সময় নয়।

বাংলাদেশের মার্ক্সবাদীদের দেখে আপনি হয়তো বলবেন সমাজতন্ত্র নিজেই ধর্ম হয়ে উঠতে চেয়েছিল। ধর্মের মধ্যে থেকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাস অন্তরে লালন করা যায় না, এ ধরণের চিন্তা সমাজতন্ত্রের বারোটা বাজিয়েছে। কারণ বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের কথা বলা লোকগুলো সারাজীবন নামাজ রোজা থেকে একশ গজ দূরে থেকে মরার আগে একটা হজ্ব করে ফেলে। ভেতরে মুসলমান, প্রকাশ্যে নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণের সর্বাত্মক চেষ্টা। যেন নামাজ রোজা করলে ইজ্জত থাকে না। এরা সমাজতন্ত্রের বেসিকই তিন টুকরা বইয়ের মধ্যে সীমিত করে ফেলেছে। আমি আপনার সাথে সর্বাংশে সহমত পোষণ করি। আসলে মার্ক্স কখনো ধর্মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কিছু বলেননি যেটা আমাদের দেশের মার্ক্সবাদীরা হয়তো বুজতে পারেননি কিংবা ভুলভাবে বুঝেছেন।

পরিশেষে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ কিন্তু উপরের আলোচনার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়ের অবতারণা করে শেষ করবো। বাংলাদেশে করোনা মহামারীর এই গভীর সংকটময় মূহুর্তে বিভিন্ন ব্যক্তিমানুষ ও সংগঠন যে যেভাবে পারছেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাধুবাদ জানাই। বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোও মাঠে ত্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। তবে এই মুহূর্তে বামপন্থীদের কর্মকাণ্ড আর এনজিও-র কর্মকাণ্ডের মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখতে পাই না। বামপন্থীরাতো “দুনিয়ার মজদুর এক হও” স্লোগান নিয়ে একটি বৈপ্লবিক রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করেন। কিন্তু এখন আপনাদের বড় বেশি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী মনে হচ্ছে। তা না হলে এখন ফসলের দাম না পাওয়া কৃষক ও মজুরি না পাওয়া গার্মেন্টস কর্মীদের রাস্তার আন্দোলনে আপনারা বৈপ্লবিক রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে হাজির থাকতেন। পু্ঁজিবাদী আদর্শ ধারণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনারা স্লোগান মুখর থাকেন। কিন্তু যে শ্রমিক ও শ্রমিকের অধিকার আপনাদের আদর্শের কেন্দ্রবিন্দু সেই শ্রমিকদের দূর্দিনে আপনারা রাস্তায় তাদের পাশে নেই। প্রয়োজনের মূহুর্তে আপনারা বড় বেশি অরাজনৈতিক।

ভাই ! হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি। চলুন, আমি আপনি ঘুমাতে যাই কিংবা টিভিতে জীবন বাচাতে হিমসিম খাওয়া কৃষক, মজুর, শ্রমিকদের অসহায় মুখ ও উপায়হীন আন্দোলন দেখি। চিন্তা কি ভাই, সব দোষ ও দায়িত্ব বামপন্থীদের এ কথাতো বলেই দিলাম। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার আকুতি, জীবন-যন্ত্রণা সে-তো শ্রমিকদের আর তাদের পাশে দাড়ানোর একমাত্র দায়িত্ব বামপন্থীদের। আমার- আপনার তাতে কি আসে যায়? আমি- আপনিতো শ্রমিক নই!

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)
ঢাকা, বাংলাদেশ।

image_printPrint

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুজিব বর্ষ

মুজিববর্ষ

সংবাদ আর্কাইভ

নামাজের সময় সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৪
  • ১২:০৭
  • ৪:৪৩
  • ৬:৫৩
  • ৮:১৮
  • ৫:১৮

ক্যালেন্ডার

July 2020
M T W T F S S
« Jun    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031